জীবনযাপনফ্যাশন

ঋতু বদলের হাওয়ায় চিরুনিতে বাড়ছে দুশ্চিন্তা : কেন এই অকাল কেশপাত?

0
j2

শীতের রুক্ষতা কাটিয়ে প্রকৃতিতে এখন ফাল্গুনের হাওয়া বইছে । প্রকৃতি নতুন করে সাজলেও অনেকের কপালে দেখা দিয়েছে চিন্তার ভাঁজ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বা সকালে ঘুম থেকে উঠে বালিশের দিকে তাকালেই মন খারাপ হচ্ছে অনেকেরই—একগুচ্ছ চুল হাতে চলে আসছে অবলীলায়। চিরুনি চালাতেই যেন বিদায় জানাচ্ছে প্রিয় কেশরাজি। ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে চুলের এই ‘গণপ্রস্থান’ কেবল আপনার একার সমস্যা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের এক মজার রহস্য।

চুলেরও আছে নিজস্ব ক্যালেন্ডার

আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, আমাদের প্রতিটি চুলের একটি নির্দিষ্ট আয়ু থাকে। একে বলা হয় চুলের জীবনচক্র। সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ইউনিভার্সিটি হসপিটালের একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের চুল পড়ার হার অন্য সময়ের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়। বিশেষ করে যখন তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে, তখন শরীরের হরমোনে এমন কিছু পরিবর্তন আসে যা চুলকে দ্রুত ‘বিশ্রাম’ বা ঝরে যাওয়ার ধাপে (টেলোজেন ফেজ) পাঠিয়ে দেয়।

সহজ কথায়, গাছের পাতা যেমন নির্দিষ্ট ঋতুতে ঝরে পড়ে, আমাদের শরীরও নতুন তাপমাত্রার সাথে মানিয়ে নিতে গিয়ে পুরনো চুল ঝরিয়ে নতুন চুলের পথ করে দেয়।

লরিয়ালের গবেষণায় উঠে আসা এক নতুন দিক

বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান লরিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন (L’Oréal Research & Innovation) চুলের এই ভাঙন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এক চমৎকার তথ্য বের করেছে। তারা দেখিয়েছে, ঋতু বদলের সময় আমাদের যে চুল পড়ে, তার সবটুকু কিন্তু গোড়া থেকে পড়ে না।

বাতাসে আর্দ্রতা বা হিউমিডিটি বাড়লে চুলের বাইরের আবরণ বা ‘কিউটিকল’ ফুলে ওঠে। এতে চুল তার নমনীয়তা হারিয়ে ফেলে এবং খুব সহজেই জট পাকিয়ে যায়। লরিয়ালের বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘হেয়ার ব্রেকএজ’। অর্থাৎ, গোড়া থেকে নয়, বরং শুষ্কতা আর আর্দ্রতার লড়াইয়ে চুল মাঝখান থেকেই ভেঙে যাচ্ছে। ফলে চিরুনি চালানোর সময় আপনার মনে হচ্ছে চুল বুঝি সব শেষ হয়ে যাচ্ছে!

বিপদ যখন নিজের অভ্যাসে

শুধু আবহাওয়াকে দোষ দিলে কিন্তু চলবে না; ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে আমাদের কিছু ভুল অভ্যাসও চুলের বারোটা বাজিয়ে দেয়।

অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস: শীতের শেষে আমরা অনেক সময় পুষ্টিকর শাকসবজি খাওয়া কমিয়ে দিই। শরীরে আয়রন, জিংক বা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে নতুন চুল গজানোর প্রক্রিয়া থমকে যায়, যা এই সময়ে চুল পড়ার হারকে দ্বিগুণ করে তোলে।

ভুল প্রসাধনী নির্বাচন: আবহাওয়া বদলালেও আমরা অনেকেই সারা বছর একই শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার ব্যবহার করি। শীতের ভারী ময়েশ্চারাইজিং শ্যাম্পু গরমে ব্যবহার করলে স্ক্যাল্প অতিরিক্ত তৈলাক্ত হয়ে পড়ে, যা চুলের গোড়াকে আলগা করে দেয়।

আরও পড়ুনঃ ৯০ সেকেন্ডের সাইলেন্ট টেকনিক : বদলে যাবে আপনার সম্পর্কের রসায়ন

মানসিক চাপ ও অপর্যাপ্ত ঘুম: ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ মেকানিজমে পরিবর্তন আসে। এই সময়ে অতিরিক্ত কাজের চাপ বা ঘুমের অভাব ‘কর্টিসল’ হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা সরাসরি চুলের ফলিকলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অতিরিক্ত হিট স্টাইলিং: চুল শুকানোর তাড়াহুড়োয় ব্লো-ড্রায়ার বা স্টাইল করার জন্য স্ট্রেটনারের অতিরিক্ত ব্যবহার চুলের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা কেড়ে নেয়। আবহাওয়া এমনিতেই শুষ্ক থাকে, তার ওপর কৃত্রিম তাপ চুলকে প্রাণহীন করে তোলে।

কী করবেন? সমাধান এখন হাতের নাগালেই

খাবারের পাতে থাকুক যত্ন:

চুলের শক্তি আসে ভেতর থেকে। এই সময়ে খাবারে প্রোটিন, বায়োটিন, আয়রন এবং ভিটামিন-সি বাড়াতে হবে। সামুদ্রিক মাছ, কাঠবাদাম, ডিম খাবার তালিকায় যুক্ত করুন। তাছাড়া প্রতিদিন অন্তত একটি আমলকী বা লেবু খেলে আয়রন শোষণে সুবিধা হয়, যা চুলকে মজবুত করে।

শ্যাম্পু করার ব্যাকরণ:

লরিয়াল গবেষণার পরামর্শ অনুযায়ী, এই সময়ে কেবল শ্যাম্পু করলেই হবে না, কন্ডিশনার মাস্ট! এটি চুলের ওপর একটি অদৃশ্য সুরক্ষা স্তর তৈরি করে, যা বাইরের আর্দ্রতা থেকে চুলকে বাঁচায় এবং মাঝখান থেকে ভেঙে যাওয়া রোধ করে।

শ্যাম্পু বদলের রসায়ন: গরমের শুরুতেই বেছে নেওয়া উচিত হালকা বা ‘ক্লারিফায়িং’ (Clarifying) কোনো সালফেট ও প্যারাবেন মুক্ত মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করুন, যা স্ক্যাল্পের বাড়তি তেল ও ময়লা দূর করে চুলকে হালকা রাখবে।

চিরুনি: রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে কাঠের মোটা দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করুন। প্রতিদিন হালকাভাবে চুলে চিরুনি চালালে স্কাল্প সুস্থ থাকে। এতে চুলের গোড়া মজবুত হয় এবং নতুন চুলও বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত ব্যবহারে চুল উজ্জ্বল ও ঝলমল করে।

প্রাকৃতিক টোটকা: সপ্তাহে অন্তত একদিন টক দই আর মেথি বাটার মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। এটি স্ক্যাল্পের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে দারুণ কার্যকর।

আপনার জন্য দরকারি চেক-বক্স

  • কড়া রোদে বেরোনোর সময় স্কার্ফ বা ছাতা ব্যবহার করছেন তো?
  • দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার পানি খাচ্ছেন?
  • ভেজা অবস্থায় চুল আঁচড়ানোর ভুলটা করছেন না তো?

দিনে ১০০ থেকে ১২০টি চুল পড়া কিন্তু একদম স্বাভাবিক। তাই ছোটখাটো এই পরিবর্তন দেখে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। তবে যদি দেখেন মাথার কোনো নির্দিষ্ট অংশ একদম ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, তবে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সঠিক পুষ্টি আর সামান্য সচেতনতা থাকলে ঋতু বদলের এই ঝড় ঝাপটা সামলে আপনার চুল থাকবে আগের মতোই প্রাণবন্ত।

জয়া মাহবুব

একুশে বইমেলা : উদ্যোক্তাদের জন্য অদেখা ব্র্যান্ডিং স্কুল

Previous article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *