উদ্যোক্তার গল্পদেশি উদ্যোক্তা

কনফারেন্স–ইভেন্টে অংশগ্রহণ : উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বিস্তারের স্মার্ট স্ট্র্যাটেজি

1
a2

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন এখন আর বড় শহর বা অভিজাত মহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রাম থেকে শহর, অনলাইন থেকে অফলাইন—সব জায়গায় নতুন উদ্যোক্তার উত্থান হচ্ছে। কেউ হোমমেড ফুড বিক্রি করছেন, কেউ পোশাক, কেউ প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ, আবার কেউ ছোট কারখানা গড়ে তুলছেন। তবে সবার মাঝেই একটি সাধারণ প্রশ্ন থাকে—কীভাবে ব্যবসা আরও বড় করবো?

অনেকে মনে করেন, শুধু ভালো প্রোডাক্ট কিংবা পুঁজিই ব্যবসা বড় করার মূল শর্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এর চেয়েও বড় শক্তি হলো—নেটওয়ার্ক বা সম্পর্কের জাল তৈরি করা। আর এই নেটওয়ার্ক তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা হচ্ছে বিভিন্ন বিজনেস কনফারেন্স, সেমিনার ও উদ্যোক্তা-ইভেন্ট।

আজকের ফিচারটি মূলত এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে—

  • বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা কিভাবে এসব কনফারেন্স ও ইভেন্টে অংশ নিয়ে নিজেদের ব্যবসা বড় করতে পারেন?
  • তারা কীভাবে প্রস্তুতি নিলে ইভেন্ট সত্যিকারের কাজে লাগে?
  • কনফারেন্সে গেলে আসলে কী পাওয়া যায়?

অনেকেই মনে করেন কনফারেন্সে যাওয়া মানে শুধু কিছু বক্তৃতা শোনা। কিন্তু এর প্রকৃত সুবিধা অনেক গভীরে।

নেটওয়ার্কিং: আপনার ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞ মেন্টর, সম্ভাব্য ইনভেস্টর এবং পার্টনারদের সাথে সরাসরি দেখা করার সুযোগ।

বাজারের ধারণা: বর্তমান বিশ্বে আপনার সেক্টরে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে বা নতুন কী প্রযুক্তি যোগ হচ্ছে, তা জানা যায়।

ব্র্যান্ডিং: নিজের স্টার্টআপ বা ব্যবসাকে পরিচিত করার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম পাওয়া যায়।

ফান্ডিং ও পার্টনারশিপ: অনেক ক্ষেত্রে সঠিক মানুষের সাথে পরিচয় থেকে বড় কোনো বিনিয়োগ বা ব্যবসায়িক চুক্তি  সম্পন্ন হতে পারে।

কেন নেটওয়ার্কিং উদ্যোক্তার জন্য এত জরুরি?

নেটওয়ার্কিং কেবল কার্ড বিনিময় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। এটি একজন উদ্যোক্তাকে যা যা দেয়-

সঠিক সরবরাহকারী: সঠিক দামে ভালো কাঁচামাল পাওয়ার উৎস খুঁজে পাওয়া যায়।

বাজার বিশ্লেষণ: নতুন ট্রেন্ড এবং গ্রাহকের চাহিদা সম্পর্কে অগ্রিম ধারণা পাওয়া যায়।

মানসিক সাপোর্ট: ব্যবসার কঠিন সময়ে অভিজ্ঞ মেন্টর বা সহকর্মীর পরামর্শ হাল ধরতে সাহস দেয়।

পুঁজি ও বিনিয়োগ: অনেক সময় বিনিয়োগকারী পাওয়ার পথ তৈরি হয় পরিচিতির মাধ্যমেই।

কনফারেন্সকে ব্যবসার বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের উপায়

সঠিক ইভেন্ট নির্বাচন: আপনার ব্যবসার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইভেন্টে অংশ নিন। ধরুন আপনি আইটি নিয়ে কাজ করেন, তাহলে টেক-এক্সপো বা গ্লোবাল আইটি সামিটগুলো আপনার জন্য বেশি কার্যকর।

কোলাবরেশন মাইন্ডসেট: প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতার দিকে নজর দিন। অন্য কোনো উদ্যোক্তার সাথে মিলে কীভাবে যৌথভাবে কাজ করা যায়, সেই আলোচনা শুরু করুন।

ইনভেস্টরদের সাথে কথা বলা: নিজের বিজনেস মডেলটি সংক্ষিপ্ত ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করুন।

গ্লোবাল এক্সপোজার: আন্তর্জাতিক কনফারেন্স হলে বিদেশের বাজারে আপনার পণ্য বা সেবা রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই করুন।

ইভেন্টকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি

প্রস্তুতিহীনভাবে কনফারেন্সে যাওয়া অনেকটা অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধে যাওয়ার মতো। তাই ইভেন্টটি সত্যিকারের কাজে লাগাতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

আরও পড়ুনঃ নারী উদ্যোক্তা : স্বপ্নের ভেতর থেকে বাস্তবের গল্প – এলিন মাহবুব

রিসার্চ: ইভেন্টের আগে কারা স্পিকার হিসেবে আসছেন বা কোন কোন কোম্পানি অংশ নিচ্ছে, তার তালিকা দেখে নিন। যাদের সাথে দেখা করতে চান, আগে থেকেই তাদের লিংকডইন-এ কানেক্ট হতে পারেন।

পিচ রেডি রাখা: কেউ যদি জিজ্ঞেস করে “আপনার ব্যবসা কী নিয়ে?”, তবে যেন ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে আপনি চমৎকারভাবে উত্তর দিতে পারেন।

বিজনেজ কার্ড ও কিট: পর্যাপ্ত বিজনেস কার্ড এবং আপনার ব্যবসার একটি সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল বা ক্যাটালগ সাথে রাখুন।

সক্রিয় অংশগ্রহণ: ইভেন্টের সময় শুধু দর্শক হয়ে না থেকে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিন এবং প্যানেলিস্টদের সাথে কথা বলুন।

নোট নেওয়া: নতুন কোনো আইডিয়া বা তথ্য পেলে সাথে সাথে টুকে রাখুন।

ফলো-আপ: ইভেন্ট শেষ হওয়ার ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যাদের সাথে পরিচয় হয়েছে, তাদের একটি ইমেইল বা মেসেজ দিয়ে ধন্যবাদ জানান এবং আলোচনার সূত্র ধরে পরবর্তী মিটিংয়ের প্রস্তাব দিন। একটি কনফারেন্স আপনার ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, যদি আপনি সঠিক লক্ষ্য নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। পরিচয় থেকে সুযোগ তৈরি করাই হলো একজন সফল উদ্যোক্তার কাজ।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কনফারেন্সের বিশেষত্ব

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নেটওয়ার্কিং একটি নীরব বিপ্লব। এটি তাদের সাহায্য করে-

আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে: “আমি কি পারব?”—এই সংশয় কাটিয়ে অন্যদের সফলতার গল্প শুনে সাহস সঞ্চয় করা যায়।

একাকীত্ব দূর করতে: উদ্যোক্তা জীবন অনেক সময় একাকীত্বের হয়। সমমনা নারীদের সাথে মিশলে বোঝা যায়, লড়াইটা শুধু তার একার নয়।

কোথায় এবং কীভাবে তৈরি করবেন আপনার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক?

নেটওয়ার্কিং মানে শুধু ভিড় বাড়ানো নয়, বরং সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করা। বর্তমান বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের জন্য প্ল্যাটফর্মের অভাব নেই। তবে সেই সুযোগগুলোকে ‘কৌশলগতভাবে’ ব্যবহার করা শিখতে হবে।

স্টার্টআপ সামিট ও ইনোভেশন ফেয়ার প্রযুক্তির মেলবন্ধন: এসব ইভেন্টে সাধারণত তরুণ উদ্যোক্তা, টেক-এক্সপার্ট এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা আসেন। আধুনিক প্রযুক্তি এবং ব্যবসার ডিজিটাল রূপান্তর সম্পর্কে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

এস এম ই ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তা মেলা: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এটি সবথেকে বড় প্ল্যাটফর্ম। এখানে সরাসরি ক্রেতা এবং পাইকারি বিক্রেতাদের সাথে পরিচয় হয়। পণ্য প্রদর্শন এবং সরাসরি কাস্টমার ফিডব্যাক পাওয়ার জন্য এটি একটি বড় সুযোগ।

পাশের স্টলের উদ্যোক্তার সাথে সম্পর্ক তৈরি করুন। হতে পারে তার কাঁচামাল সরবরাহকারী আপনার উপকারে আসবে, অথবা আপনাদের পণ্য একে অপরের পরিপূরক হতে পারে যেমন: আপনার বুটিক পণ্যের সাথে অন্য কারো হ্যান্ডমেড গয়না।

চেম্বার অব কমার্স বা ই-ক্যাব: ই-কমার্স বা বড় বাণিজ্যের সাথে যুক্ত হতে হলে এসব সংগঠনের সদস্য হওয়া বা ইভেন্টে যাওয়া জরুরি। লাইসেন্সিং, পলিসি এবং বড় বড় করপোরেট ডিল সম্পর্কে জানতে  হলে আপনার এই ইভেন্টগুলো অংশগ্রহণ করতে হবে।

এসব জায়গায় অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা থাকেন। তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনুন। “আপনার ব্যবসার শুরুর চ্যালেঞ্জ কী ছিল?”—এই একটি প্রশ্ন আপনাকে অনেক বড় মেন্টরশিপ এনে দিতে পারে।

বিসিকএবং বিশ্ববিদ্যালয় ফোরাম: বিসিক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভেন্টগুলো মূলত সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও নতুন মেধার সমন্বয় ঘটায়, যেখান থেকে আপনি সরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, পণ্য বিপণন সহায়তা, বিএসটিআই  অনুমোদনের সঠিক প্রক্রিয়া এবং ব্যবসার জন্য দক্ষ ইন্টার্ন বা কর্মী খুঁজে পেতে পারেন।

এসব জায়গায় নেটওয়ার্কিংয়ের মূল কৌশল হলো সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে পেশাদার ও সুসম্পর্ক গড়ে তোলা; যা ভবিষ্যতে আপনার ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স, আইনি দাপ্তরিক কাজ এবং নীতিগত জটিলতা নিরসনে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।

সময় অপচয় এড়িয়ে সুযোগকে যেভাবে সাফল্যে রূপান্তর করবেন

ভিড়ের পেছনে সময় নষ্ট না করা: ইভেন্টে গিয়ে সবাই শুধু মূল বক্তার সাথে কথা বলতে চায়। ফলে সেখানে দীর্ঘ লাইন থাকে এবং কথা বলার সুযোগ মেলে না।

মূল বক্তার চেয়েও দর্শকদের সারিতে বসা অন্যান্য উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলুন। আপনার পরবর্তী পার্টনার বা ক্লায়েন্ট হয়তো আপনার পাশের সিটেই বসে আছেন।

“চা-কফি বিরতি” হলো আসল গোল্ডমাইন: অনেকে বিরতির সময় একা বসে থাকেন বা মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন। এটি সুযোগের চরম অপচয়। বিরতির সময়টি হলো ইনফরমাল নেটওয়ার্কিংয়ের সেরা সময়। হাতে কফির কাপ নিয়ে এগিয়ে যান, নিজের পরিচয় দিন। ডাইনিং টেবিল বা কফি কর্নারেই সবচেয়ে বড় বড় বিজনেস ডিল শুরু হয়।

তথ্য সংগ্রহ করে ফলো-আপ না করা: কার্ড নিলেন কিন্তু ড্রয়ারে ফেলে রাখলেন—এটি বড় ধরনের অপচয়। কার্ড নেওয়ার পর তার পেছনে ছোট করে লিখে রাখুন ব্যক্তিটি কে এবং কী নিয়ে কথা হয়েছিল। ইভেন্ট শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাকে একটি লিঙ্কডইন রিকোয়েস্ট বা ইমেইল পাঠান। এই একটি ছোট কাজ আপনাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলবে।

উদ্যোক্তা হওয়া মানে শুধু পণ্য বিক্রি নয়, বরং এটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের যাত্রা। এই যাত্রায় আপনার চারপাশের মানুষগুলোই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। একটি কথা সবসময় মনে রাখবেন, “আপনার নেটওয়ার্কই আপনার আসল সম্পদ”।

এলিন মাহবুব

বাতিল-অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমানোর নেশাই যখন রোগ

Previous article

২০২৬-এর উদ্যোক্তা : গতির চেয়ে সঠিক পথই যখন আসল চ্যালেঞ্জ

Next article

You may also like

1 Comment

  1. […] আরও পড়ুনঃ কনফারেন্স–ইভেন্টে অংশগ্রহণ : উদ্যোক্… […]

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *