জাতীয়

জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে টিকে থাকার লড়াইয়ে বাংলাদেশ

0
uj2

পৌষের শেষভাগে এসে বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত জলবায়ু বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে উত্তরের জেলাগুলোতে হাড়কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহ আর ঘন কুয়াশায় জনজীবন স্থবির, অন্যদিকে গত বছরের প্রলয়ংকরী তাপপ্রবাহের স্মৃতি এখনো জনমনে টাটকা। জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র দোলাচল এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং বাংলাদেশের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের এক রূঢ় বাস্তবতা।

প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা: ভালো-মন্দের দোলাচল

২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করলে মুদ্রার দুটি পিঠই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মন্দ পরিস্থিতি: যখন প্রকৃতি প্রতিপক্ষ

চরম আবহাওয়ার ঘনঘটা: বর্তমানে দেশের ৪৪টিরও বেশি জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু জেলাতে তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে এসেছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, ঋতুচক্রের এই অস্বাভাবিক আচরণ—কখনো তীব্র শীত, আবার কখনো দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ—আসন্ন বড় কোনো সংকটের পূর্বাভাস।

লবণাক্ততার থাবা ও কৃষিঝুঁকি: দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে ধান চাষ ব্যাহত হচ্ছে এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে।

অকাল বন্যা ও বৃষ্টিপাত: গত বছরগুলোতে দেখা গেছে, বর্ষার সময়ে বৃষ্টি নেই, কিন্তু অসময়ে অতিবৃষ্টির ফলে আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

আরও পড়ুনঃ বিষাক্ত বাতাসে বন্দি ঢাকা : যখন নিঃশ্বাস নেওয়াই ঝুঁকির কারণ

ভালো পরিস্থিতি: লড়াই করার সক্ষমতা সবটুকু আঁধার নয়, আশার আলোও আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ‘রোল মডেল’।

অভিযোজনে সাফল্য: বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টায় লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন এবং ভাসমান সবজি চাষ উপকূলীয় মানুষের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি: ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভাবনীয় উন্নতি করেছে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কমেছে।

সবুজ বেষ্টনী ও বনায়ন: সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনায়ন এবং দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি কার্বন শোষণে ও জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধে ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

সংকট যেখানে গভীর

বিশ্বব্যাংক ও আইপিসিসি (IPCC)-এর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ১৭-১৮ শতাংশ উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি মানুষ ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হওয়ার আশঙ্কায় আছেন। বর্তমানের তীব্র শীত বা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ এই সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনেরই খণ্ডচিত্র মাত্র।

আমাদের করণীয়

জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব মোকাবিলায় কেবল স্থানীয় প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুত জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক চাপ অব্যাহত রাখা জরুরি। দেশীয় পর্যায়ে নদী খনন, প্লাস্টিক দূষণ রোধ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোই হতে পারে আমাদের টিকে থাকার মূলমন্ত্র।

“প্রকৃতি হয়তো প্রতিশোধ নিচ্ছে, কিন্তু আমাদের উদ্ভাবনী শক্তি ও অভিযোজন ক্ষমতাই পারে এই বাংলাকে আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে রাখতে।”

মো. মাসুদুজ্জামান

শীতে ত্বকের পাওয়ারহাউস হায়ালুরোনিক অ্যাসিড 

Previous article

৯০ সেকেন্ডের সাইলেন্ট টেকনিক : বদলে যাবে আপনার সম্পর্কের রসায়ন

Next article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *