উদ্যোক্তার গল্পদেশি উদ্যোক্তা

ভেতরের কন্ঠস্বরই কি আপনার ব্যবসার সাফল্যের চাবিকাঠি? 

1
j1

ব্যবসায়িক জটিলতায় যখন স্প্রেডশিট বা ডাটা কোনো দিশা দিতে পারে না, তখন সফল উদ্যোক্তারা ভরসা করেন নিজের ‘ছয় নম্বর ইন্দ্রিয়’ বা ভাইব মেথডের ওপর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইনটুইশন কেন হতে পারে আপনার সাফল্যের তুরুপের তাস?

ঢাকার যানজটে আটকে থেকে জুম মিটিং সামলানো কিংবা খাতুনগঞ্জের আড়তে বসে পাইকারি দরের হিসেব মেলানো—বাংলাদেশের প্রতিটি উদ্যোক্তার সংগ্রামটা একদমই ভিন্ন। এ দেশের উদ্যোক্তাদের প্রতিনিয়ত শিখতে হয় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে। অ্যাকাডেমিক বই কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোর ডাটা-চালিত ‘সাকসেস মডেল’ আমাদের শেখায় নিখুঁত স্প্রেডশিট আর জটিল গ্রাফ অনুসরণ করতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সফল তারাই হন, যারা লজিকের চেয়েও নিজের অন্তরের ডাক বা ‘ভাইব মেথড’-কে বেশি গুরুত্ব দিতে জানেন।

বাংলাদেশের বাজার কেবল শুকনো সংখ্যার হিসেব মানে না। এখানে রাতারাতি নীতি বদলে যায়, মুদ্রাস্ফীতির পারদ ওঠানামা করে মুহূর্তের ব্যবধানে। এমন এক অনিশ্চিত পরিবেশে যেখানে তথ্যের চেয়ে অনুমান অনেক সময় বেশি কার্যকর, সেখানে একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হলো তার ‘ইনটুইশন’ বা সহজাত বোধ। এটি কেবল হুট করে আসা কোনো অনুভূতি নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া এক ধরণের সূক্ষ্ম অবচেতন প্রজ্ঞা।

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে এই বিষয়টিই ‘ভাইব মেথড’ নামে এক নতুন বিপ্লব তৈরি করেছে। ফোর্বসের কলামিস্ট এবং উদ্যোক্তা জডি কুক এই পদ্ধতির প্রবক্তা। এই পদ্ধতির মূল কথা হলো—ব্যবসায়িক জটিল সিদ্ধান্তে কেবল তথ্যের মুখাপেক্ষী না থেকে নিজের সহজাত বুদ্ধিকে প্রধান্য দেওয়া। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে তথ্যের চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বেশি পরিবর্তনশীল, সেখানে এই ‘ভাইব মেথড’ কেবল একটি থিওরি নয়, বরং সফল হওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

তথ্য যখন বিভ্রান্ত করে

বিখ্যাত কলামিস্ট জডি কুক-এর মতে, ডাটা বা তথ্য সবসময় অতীতের কথা বলে, কিন্তু ইনটুইশন বা ‘ভাইব’ বলে ভবিষ্যতের কথা। অনেক সময় দেখা যায়, কাগজে-কলমে কোনো পার্টনারশিপ বা বিনিয়োগ খুব লাভজনক মনে হচ্ছে, কিন্তু ভেতরের মন বলছে—‘এখানে কিছু একটা ভুল আছে’। ভাইব মেথড বলছে, এই দ্বিধাকে অবহেলা করবেন না।

অ্যাপল-এর প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস একবার বলেছিলেন, “আপনার সময় সীমিত, তাই অন্যের জীবন যাপন করে এটি নষ্ট করবেন না। অন্যের মতামতের ভিড়ে নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে হারিয়ে যেতে দেবেন না।”

যখন স্নায়ুতন্ত্র আগে কথা বলে

আমাদের স্নায়ুতন্ত্র অনেক সময় মস্তিষ্কের সচেতন চিন্তার চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। ভাইব মেথডের ভাষায়, একে বলা হয় আপনার শরীরের ‘ফিজিক্যাল ফিডব্যাক’। বড় কোনো ব্যবসায়িক চুক্তিতে সই করার আগে কিংবা নতুন কোনো অংশীদার নির্বাচনের সময় নিজের শরীরের পরিবর্তনের দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিন।

আরও পড়ুনঃ সংকট যখন রূপান্তরের কারিগর

আপনার কাঁধ কি হঠাৎ শক্ত হয়ে যাচ্ছে বা দম বন্ধ ভাব লাগছে? ভাইব মেথডে একেই বলা হয় ‘কন্ট্রাকশন’ বা সংকোচন। এটি আপনার শরীরের দেওয়া একটি লাল বাতি। এর মানে হলো—কাগজে-কলমে সবকিছু ঠিকঠাক দেখালেও আপনার অবচেতন মন বা ইনটুইশন সেখানে কোনো বড় ঝুঁকি বা অমিল খুঁজে পেয়েছে।

অন্যদিকে, কোনো নতুন আইডিয়া বা প্রজেক্ট নিয়ে ভাবলে যদি আপনার ভেতর থেকে এক ধরণের স্বস্তি, হালকা অনুভব বা রোমাঞ্চ জাগে, তবে তাকে বলা হয় ‘এক্সপেনশন’ বা প্রসারণ। এটি আপনার শরীরের দেওয়া সবুজ সংকেত। স্টিভ জবস যেমনটি বলেছিলেন, নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিন। ডাটা যখন আপনাকে দ্বিধায় ফেলে দেয়, তখন আপনার শরীরের এই স্নায়বিক সংকেতই হতে পারে আপনার ব্যবসার সবচেয়ে নিখুঁত কম্পাস।

বাংলাদেশের সফল উদ্যোক্তাদের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্র্যাক-এর প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ বা আজকের দিনের সফল স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতারা অনেক সময়ই তথ্যের চেয়ে মানুষের প্রয়োজন এবং নিজের ভেতরের তাড়নাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

সাফল্যের ৩টি ‘ভাইব’ মন্ত্র

‘এনিওয়ে টেস্ট’: নিজেকে প্রশ্ন করুন—যদি এই ব্যবসা থেকে বড় মুনাফা না থাকতো, তবুও কি আমি এটি করতাম? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে বুঝবেন আপনি সঠিক পথে আছেন। ওয়ারেন বাফেট বলেন, “যে কাজ আপনি ভালোবেসে করেন, সেখানে সাফল্য আসবেই।”

সংখ্যা বাড়ানোর নেশা ত্যাগ করুন: ফেসবুকে কত লাইক হলো বা কতগুলো অ্যাওয়ার্ড পেলেন—এগুলো অনেক সময় ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির ভুল ধারণা দেয়। বরং খেয়াল করুন আপনার কাজ আপনাকে মানসিক প্রশান্তি দিচ্ছে কি না। যদি ব্যবসা আপনাকে প্রতিনিয়ত অবসাদগ্রস্ত করে তোলে, তবে বুঝতে হবে আপনার উদ্দেশ্য সঠিক জায়গায় নেই। যখন কাজ আপনার ভালো লাগার সাথে মিলে যায়, তখন প্রবৃদ্ধি এমনিতেই ত্বরান্বিত হয়।

 ঝুঁকি নিতে ভয় পাবেন না: অনেক সময় সেরা সুযোগগুলো শুরুতে একটু ‘পাগলামি’ মনে হতে পারে। লজিক বা ডাটা হয়তো বলবে এই পথে ঝুঁকি বেশি, কিন্তু আপনার ইনটুইশন হয়তো সেখানে বড় কোনো সম্ভাবনা দেখছে। নেটফ্লিক্স বা এয়ারবিএনবি-র মতো সফল কোম্পানিগুলো শুরু হয়েছিল এমনই কিছু ‘অযৌক্তিক’ সাহসের ওপর ভর করে। জাকারবার্গের ভাষায়, “সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কোনো ঝুঁকি না নেওয়া।” ইনটুইশন যদি সায় দেয়, তবে ডাটা ছাড়াই ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস থাকাই একজন প্রকৃত উদ্যোক্তার লক্ষণ।

কেন এটি বাংলাদেশের জন্য জরুরি?

আমাদের দেশে বাজারের তথ্য সবসময় নির্ভুল থাকে না। আজকের পলিসি কাল বদলে যেতে পারে। এমন পরিবেশে আপনার অভিজ্ঞতালব্ধ ‘সহজাত বুদ্ধি’ বা ইনটুইশনই হতে পারে আপনার সেরা কম্পাস।

আপনার পরবর্তী বড় সাফল্য হয়তো কোনো ল্যাপটপের স্ক্রিনে নয়, বরং আপনার নিজের ভেতরে লুকিয়ে আছে। তাই স্প্রেডশিট মেলাতে মেলাতে নিজের ভেতরের সেই কণ্ঠস্বরটিকে হারিয়ে ফেলবেন না। মনে রাখবেন, ডাটা আপনাকে টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু ইনটুইশন আপনাকে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়।

জয়া মাহবুব

ডিজিটাল তথ্যযুদ্ধে উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র—স্বচ্ছতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া

Previous article

বইমেলা ও নারী উদ্যোক্তাদের সৃজনশীল জয়যাত্রা

Next article

You may also like

1 Comment

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *