মতামত

যখন জীবন কারো জন্য অপেক্ষা করে না

0
j1 2

“জীবন কারো জন্য অপেক্ষা করে না; যা করার, তা এখনই করতে হবে।” কথাটা শুনতে রূঢ়, কখনো বা নির্মম শোনায়। অথচ এই রূঢ়তার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক অস্বস্তিকর সত্য। আমাদের চারপাশের জগতটা এক নিরন্তর ঘূর্ণায়মান চাকা, যার গতি আমাদের ব্যক্তিগত দুঃখ বা ক্লান্তির তোয়াক্কা করে না।

বাস্তবতা হলো, আপনি ভীষণ কষ্টে আছেন বলে মাসের শেষে ইউটিলিটি বিল থেমে থাকবে না। মন ভালো নেই বলে অফিসের ডেডলাইন পিছিয়ে যাবে না। প্রিয়জন হারানোর শোক, আর্থিক অনটন কিংবা গুমোট হতাশার জন্য সময় এক সেকেন্ডও থমকে দাঁড়ায় না। জীবন চলে তার নিজস্ব ও নির্বিকার গতিতে। আর এই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে আমরা পিছিয়ে পড়ি—কাজে, আত্মবিশ্বাসে, এমনকি নিজের কাছেও।

সবচেয়ে বড় আঘাতটা আসে তখন, যখন আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। সকালে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না, বুকের ভেতরটা পাথর হয়ে থাকে, অথচ জানালার ওপাশে দিন শুরু হয়ে যায়। সংসার, সমাজ আর জীবিকার দাবিগুলো আমাদের কানে কানে বলে যায়—”উঠো, চলো।” আর যখন আমরা সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারি না, তখন গ্রাস করে এক তীব্র অপরাধবোধ। মনে হয়, এই অসম দৌড়ে আমিই বুঝি একমাত্র ব্যর্থ সৈনিক।

আজকালকার ‘হাসল কালচার’ আমাদের শেখায় জীবন মানেই এক অন্তহীন ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ। এই সংস্কৃতিতে বিশ্রাম মানেই আলস্য, আর থমকে যাওয়া মানেই পরাজয়। এই অতি-উৎসাহী দর্শন মানুষের মনস্তত্ত্বকে কারখানার প্রোডাকশন লাইনের মতো বিচার করে—যেখানে কেবল আউটপুটই শেষ কথা। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, মানুষের সত্তা কোনো অ্যালগরিদম নয় যে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাবে।

আমাদের ভেতরে যে ক্লান্তি আসে, তা আসলে কোনো ত্রুটি নয়; বরং তা আমাদের শরীর ও মনের এক আত্মরক্ষণমূলক সংকেত। ভেঙে পড়া বা থমকে যাওয়াটাও আমাদের অস্তিত্বের এক অপরিহার্য অংশ। যে দর্শন মানুষকে তার ক্লান্তি বা বিষণ্নতার অধিকার দিতে কার্পণ্য করে, তা শেষ পর্যন্ত মানুষকে একটি দক্ষ যন্ত্রে পরিণত করলেও, তার ভেতরকার ‘মানুষ’টিকে মেরে ফেলে।”

আরও পড়ুনঃ ৯০ সেকেন্ডের সাইলেন্ট টেকনিক : বদলে যাবে আপনার সম্পর্কের রসায়ন

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। কেবল সহানুভূতির ওপর ভর করে দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে সেই দায় হারিয়ে যায় না; বরং তা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে। দিনের শেষে এই পিছিয়ে পড়ার মাসুল আমাদেরই দিতে হয়। তাই আশ্বাস কোনো স্থায়ী সমাধান দেয় না, তা কেবল সাময়িক সান্ত্বনাই হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নয়।

তাহলে উপায় কী? সমাধান লুকিয়ে আছে এগিয়ে যাওয়ার সংজ্ঞা পরিবর্তনের মধ্যে।

অগ্রগতি মানেই সব সময় দৌড়ানো নয়। আমাদের বুঝতে হবে বিশ্রাম মানেই থমকে যাওয়া নয়। ফোনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যেমন ফোনটি নষ্ট হওয়া নয়, বরং একে সচল রাখার প্রক্রিয়া—মানুষের বিশ্রামও ঠিক তাই। বিশ্রাম হলো পুনরায় ঝাঁপিয়ে পড়ার রসদ। প্রচণ্ড বিষণ্নতার দিনেও বিছানা ছেড়ে উঠে হাত-মুখ ধোয়াটাও এক ধরনের অগ্রগতি। দশটি কাজের জায়গায় কেবল একটি কাজ শেষ করাও এক ধরনের জয়। আজকের সামান্য সঞ্চয় বা এক চিমটি সাহসই একদিন পাহাড়সম শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

নিয়মিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে আপনাকে প্রতিদিন নিখুঁত হতে হবে। নিয়মিত হওয়ার অর্থ হলো—নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিদিনের দায়টুকু অন্তত স্পর্শ করা। একদিনে দশ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম করার চেয়ে প্রতিদিন দশ মিনিটের লড়াই অনেক বেশি কার্যকর, যদি তাতে ধারাবাহিকতা থাকে।

পাশাপাশি ‘পিছিয়ে পড়া’ শব্দটাকেও আমাদের নতুন করে চিনতে হবে। বর্তমানের সোশ্যাল মিডিয়া যুগে আমরা অন্যের ঝকঝকে জীবনের সাথে নিজের অন্ধকার সময়ের তুলনা করি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রত্যেকের ঋতু আলাদা। একটি ফুল বসন্তে ফোটে, অন্যটি শীতে। তার মানে এই নয় যে শীতের ফুলটি ব্যর্থ।

নিজের কষ্টের সময়টাকে নিজের শেকড় মজবুত করার সময় হিসেবে গ্রহণ করুন। নিজের প্রতি দয়াশীল হওয়ার অর্থ নিজেকে অলসতায় সঁপে দেওয়া নয়। বরং সবচেয়ে কঠিন দিনেও নিজের জন্য অন্তত এক কদম বাড়ানোই হলো আসল আত্মসম্মান। জীবন আসলে আপনার কষ্টের হিসাব রাখে না, কিন্তু আপনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়া ঠিকই দেয়।

জীবন কারো অপেক্ষায় থমকে থাকে না ঠিকই, তবে নিজেকে নিঃশেষ করে এগিয়ে যাওয়া কখনো মূল লক্ষ্য হতে পারে না। নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে নিয়ে প্রতিদিন অল্প করে এগোনোই হলো আসল সার্থকতা।

বিশ্ববিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র একবার বলেছিলেন:

“যদি উড়তে না পারো, তবে দৌড়াও। যদি দৌড়াতে না পারো, তবে হাঁটো। যদি হাঁটতে না পারো, তবে হামাগুড়ি দাও। কিন্তু যেভাবেই হোক, তোমাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই হবে।”

আজ এক পা, কাল আরেক পা। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিন, প্রয়োজনে গতি কমান—কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস হারাবেন না। মনে রাখবেন, জীবন নির্দয় কোনো বিচারক নয়, জীবন কেবল একটি পথ। আর সেই পথে দৌড়ে প্রথম হওয়ার চেয়ে নিজের ছন্দে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকাটাই শ্রেষ্ঠ সাহসিকতা। কারণ, প্রতিকূলতার মুখে টিকে থাকাটাও এক বিশাল বড় অগ্রগতি।

জয়া মাহবুব

স্বপ্ন নয়, ডেটা বলছে—অভিজ্ঞতাই উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় পুঁজি

Previous article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *