উদ্যোক্তার গল্পদেশি উদ্যোক্তাবিদেশী উদ্যোক্তা

শখ থেকে সফল নারী উদ্যোক্তা : জয়া মাহবুব 

0
j2 1

বর্তমানে আমরা এক নীরব অথচ শক্তিশালী বিপ্লবের সাক্ষী হচ্ছি। একসময় যা ছিল ড্রয়িংরুমের কোণে বসে করা কেবল শখের কাজ—নকশিকাঁথা সেলাই, ওভেনে কেক বেকিং কিংবা ক্যানভাসে রঙের খেলা—তা আজ রূপান্তরিত হচ্ছে সফল ব্যবসায়িক মডেলে।

আজকের নারীরা প্রমাণ করছেন যে, সৃজনশীলতা আর বাণিজ্যিক বুদ্ধিমত্তার মেলবন্ধন ঘটলে ঘরোয়া একটি প্যাশনও আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারে। এটি কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং আত্মপরিচয় তৈরির এক সাহসী লড়াই।

নারীদের শখ যখন ব্যবসায়িক দর্শনের সাথে মিলে যায়, তখন তা কতটা বৈপ্লবিক হতে পারে, তার শ্রেষ্ঠ বৈশ্বিক উদাহরণ হলেন অনিতা রডিক। ১৯৭৬ সালে ইংল্যান্ডের ব্রাইটনে যখন তিনি ‘দ্য বডি শপ’ শুরু করেন, তখন সেটি ছিল কেবল নিজের সন্তানদের লালন-পালন করার জন্য বাড়তি উপার্জনের একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। অনিতার কাছে কোনো বিশাল মূলধন ছিল না, ছিল কেবল প্রাকৃতিক উপাদান নিয়ে কাজ করার প্রবল আগ্রহ।

তিনি তাঁর রান্নাঘরে ভেষজ উপাদান দিয়ে মাত্র ২৫টি প্রসাধনী তৈরি করে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরিবেশের কথা ভেবে তিনি তখন পুরনো বোতলে পণ্য রিফিল করে বিক্রি করতেন—যা ছিল সেই সময়ের সাপেক্ষে অত্যন্ত আধুনিক ও সাহসী এক চিন্তা। অনিতা কেবল প্রসাধনী বিক্রি করেননি, তিনি প্রমাণ করেছেন যে নৈতিক বাণিজ্য এবং প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা না করেও একটি আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব।

ই-কমার্স ডেটাবেস ইসিডিবি-এর ২০২৫ সালের বাজার বিশ্লেষণ এবং দ্য বডি শপের নিজস্ব আন্তর্জাতিক বাজার তালিকা অনুযায়ী দ্য বডি শপ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৭০ থেকে ৮৩টিরও বেশি দেশে সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এবং বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইআইডিই এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তাদের প্রায় ১,৩০০টিরও বেশি রিটেইল আউটলেট সক্রিয় রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ নারী উদ্যোক্তা : সহানুভূতির দেয়াল ভেঙ্গে যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রয়োজন – জয়া মাহবুব

আজ এই ব্র্যান্ডটি বিশ্বের হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তাকে এই বার্তাই দেয় যে—সততা আর সৃজনশীলতা থাকলে রান্নাঘরের ছোট পরীক্ষাটিও বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডে রূপ নিতে পারে।

অনিতা রডিকের সময়ে চ্যালেঞ্জ ছিল অনেক বেশি, কিন্তু বর্তমানের ডিজিটাল বিপ্লব নারীদের জন্য খুলে দিয়েছে অবারিত সম্ভাবনার দুয়ার। আজ সোশ্যাল মিডিয়া ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে নারীরা খুব কম বিনিয়োগেই নিজেদের কাজ বিশ্ব দরবারে তুলে ধরছেন।

আগে যেখানে একটি শোরুম বা বিপণন কেন্দ্রের জন্য প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন হতো, আজ ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের কল্যাণে তা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই পণ্যের গুণমান ও কারুকার্য সরাসরি গ্রাহককে বোঝানো সম্ভব হচ্ছে, যা লাভের অঙ্ক বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকের সাথে একটি আত্মিক সম্পর্কও তৈরি করছে।

এই রূপান্তর কেবল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিচ্ছে না, বরং নারীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলিও বিকশিত করছে। শখ থেকে শুরু করা এই উদ্যোগগুলো আজ হাজারো কর্মসংস্থান তৈরি করছে। যখন একজন নারী উদ্যোক্তা সফল হন, তিনি শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, বরং তার এই সাফল্য আরও দশজন নারীকে স্বপ্ন দেখার সাহস দেয়। এটি সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা পাঠায়—নারীরা এখন কেবল ভোক্তা নন, বরং তারা আধুনিক বাজার ব্যবস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি।

শখকে ব্যবসায় রূপান্তরের এই যাত্রা আসলে সাহসের এক অনন্য আখ্যান। অনিতা রডিকের সেই ক্ষুদ্র শুরু থেকে আজকের ঘরোয়া ডিজিটাল উদ্যোক্তা—সবার গল্পের মূলমন্ত্র একই: নিজের মেধার ওপর অবিচল বিশ্বাস। সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে আজকের নারীরা দেখাচ্ছেন যে, মেধা আর উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয় থাকলে যেকোনো স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। এই সৃজনশীল লড়াই কেবল নারীদের স্বাবলম্বী করছে না, বরং এটি আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিকে নিয়ে যাচ্ছে এক সমৃদ্ধ আগামীর পথে।

জয়া মাহবুব

নারী উদ্যোক্তা : স্বপ্নের ভেতর থেকে বাস্তবের গল্প – এলিন মাহবুব 

Previous article

শিশুমন কি কেবলই দর্পণ, নাকি তার চেয়েও বেশি : জয়া মাহবুব 

Next article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *