মতামত

শিশুমন কি কেবলই দর্পণ, নাকি তার চেয়েও বেশি : জয়া মাহবুব 

1
j1

আমরা প্রায়ই বলি, “শিশুরা নরম কাদার মতো, তাদের যেভাবে গড়া হয় তারা সেভাবেই গড়ে ওঠে।” কিন্তু ১৯৬১ সালে অ্যালবার্ট বান্দুরার সেই যুগান্তকারী ‘বোবো ডল’ পরীক্ষা আমাদের শিখিয়েছিল যে, শিশুরা কেবল অনুকরণই করে না, তারা আমাদের আচরণ থেকে রীতিমতো ‘অনুপ্রেরণা’ গ্রহণ করে—তা ভালো হোক বা মন্দ।

গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন যে, আগ্রাসন বা সহিংসতার সংস্পর্শ কীভাবে কচি মনের ওপর প্রভাব ফেলে। এই গবেষণায় শিশুদের দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল: একদল শিশু দেখেছিল একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি একটি ‘বোবো ডল’এর সাথে শান্তভাবে আচরণ করছেন, আর অন্য দলটি দেখেছিল সেই ব্যক্তিটি একটি হাতুড়ি দিয়ে পুতুলটিকে মারধর করছেন এবং আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করছেন।

ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। যে শিশুরা সহিংসতা দেখেছিল, তারা কেবল সেই আচরণের নকলই করেনি, বরং পুতুলটিকে আঘাত করার জন্য তারা নিজস্ব নতুন নতুন উপায়ও বের করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, সহিংসতার সংস্পর্শ শিশুদের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণের ক্ষেত্রে এক ধরণের ‘সৃজনশীল অনুকরণ’ তৈরি করতে পারে। এই পরীক্ষাটি শিখিয়েছিল যে শিশুরা কেবল কাজ শেখে না; তারা বড়দের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমস্যা সমাধানের ধরনও নিজেদের মধ্যে লালন করে।

এই গবেষণাটি আমাদের প্যারেন্টিং বা শিশু লালন-পালনের চিরাচরিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা মুখে শিশুদের অনেক নীতিবাক্য শেখাই, কিন্তু দিনশেষে তারা আমাদের বলা কথা নয়, বরং আমাদের আচরণ এবং আবেগীয় প্রতিক্রিয়া থেকে শিক্ষা নেয়।

আরও পড়ুনঃ শখ থেকে সফল নারী উদ্যোক্তা : জয়া মাহবুব

আলবার্ট বান্দুরা তাঁর ১৯৭৭ সালের বই সোশ্যাল লার্নিং থেওরি -তে ব্যাখ্যা করেছেন যে, “মানুষের অধিকাংশ আচরণই পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণের মাধ্যমে শেখা হয়। অন্যদের আচরণ লক্ষ্য করে মানুষ নতুন আচরণ কীভাবে সম্পাদিত হয় সে সম্পর্কে একটি ধারণা গড়ে তোলে এবং পরবর্তী সময়ে সেই ধারণা বা মানসিকভাবে সংরক্ষিত তথ্যই তার কাজের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।”

শিশুরা কেবল আপনার কাজ দেখছে না, তারা দেখছে আপনি কোনো সমস্যায় পড়লে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। আপনি কি রাগে ফেটে পড়ছেন, নাকি ধৈর্যের সাথে সমাধান খুঁজছেন? আপনার সেই প্রতিক্রিয়াটিই তাদের ভবিষ্যৎ সমস্যা সমাধানের মডেলে পরিণত হয়।

ঠিক যেভাবে নেতিবাচকতা আগ্রাসন শেখায়, তেমনি বড়দের শান্ত এবং সহানুভূতিশীল আচরণ শিশুদের মনে সহমর্মিতার বীজ বপন করে। তারা শেখে যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য চিৎকার বা শক্তির প্রয়োজন নেই, বরং বুদ্ধিমত্তা এবং ধৈর্যই যথেষ্ট।

অভিভাবক হিসেবে আমাদের প্রতিটি কাজ এবং কথা শিশুদের জীবনের এক একটি অদৃশ্য পাঠ। আমরা যদি চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সহানুভূতিশীল এবং সৃজনশীল হোক, তবে সবার আগে আমাদের নিজেদের আচরণে সেই পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখবেন, শিশুটি আপনাকে শুধু দেখছে না, সে আপনাকে নিজের ভেতর ধারণ করছে।

জয়া মাহবুব

শখ থেকে সফল নারী উদ্যোক্তা : জয়া মাহবুব 

Previous article

শীতে ত্বকের নীরব সংকেত : সংবেদনশীল ত্বক বুঝে যত্ন নিন – জয়া মাহবুব 

Next article

You may also like

1 Comment

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *