জীবনযাপন

শীতে ত্বকের নীরব সংকেত : সংবেদনশীল ত্বক বুঝে যত্ন নিন – জয়া মাহবুব 

0
j1

শীত এলেই অনেকের ত্বক সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে—বিশেষ করে যাদের ত্বক সংবেদনশীল। হঠাৎ শুষ্কতা, লালচে ভাব, টানটান অনুভূতি কিংবা চুলকানি—এই উপসর্গগুলো শীতকালে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ, ঠান্ডা বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকে ফলে ত্বকের স্বাভাবিক জলীয় অংশ দ্রুত কমিয়ে দেয়। এই সময় ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ও কোমল একটি স্কিন কেয়ার রুটিন।

সংবেদনশীল ত্বক বলতে কী বোঝায়?

সংবেদনশীল ত্বক এমন এক ধরনের ত্বক, যা খুব সহজেই পরিবেশের পরিবর্তন বা স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টের প্রতিক্রিয়া দেখায়। সামান্য ভুল প্রোডাক্ট ব্যবহারেই ত্বক লাল হয়ে যেতে পারে, জ্বালা করতে পারে কিংবা অস্বস্তি তৈরি হয়। সাধারণত ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর (স্কিন ব্যারিয়ার) দুর্বল হলে এমনটা ঘটে।

শীতকালে এই সমস্যা আরও বাড়ে। ঠান্ডা বাতাস ও কম আর্দ্রতার কারণে ত্বক দ্রুত পানি হারায়। ফলে ত্বক খসখসে হয়ে যায়, কখনও কখনও ফাটলও দেখা দেয়। এই অবস্থায় ত্বক আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং সহজেই জ্বালা বা ব্রণের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সংবেদনশীল ত্বকের জন্য শীতকালীন যত্নের রুটিন

শীতে ত্বকের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নরম ব্যবহার, পর্যাপ্ত আর্দ্রতা এবং স্কিন ব্যারিয়ার সুরক্ষা।

সকালবেলার যত্ন

মাইল্ড ক্লিনজিং: দিনের শুরুতে খুব হালকা, সালফেটমুক্ত ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন। বেশি ফেনা হয় এমন ক্লিনজার এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ এগুলো ত্বক আরও শুষ্ক করে দেয়।

হালকা টোনিং: অ্যালোভেরা, গোলাপজল বা গ্লিসারিনযুক্ত টোনার ত্বককে শান্ত করে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

হাইড্রেটিং সিরাম: শীতে সংবেদনশীল ত্বকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হাইড্রেশন। তাই হালকা কিন্তু কার্যকর সিরাম ব্যবহার করুন, যা ত্বকের ভেতরে আর্দ্রতা ধরে রাখে।

ময়েশ্চারাইজিং: ঘন কিন্তু ফ্র্যাগরেন্সমুক্ত ময়েশ্চারাইজার বেছে নিন। এটি ত্বকের ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, যা ঠান্ডা বাতাসের ক্ষতি থেকে ত্বককে বাঁচায়।

সান প্রোটেকশন: শীত হলেও সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বক রক্ষা করা জরুরি। তাই বাইরে বের হওয়ার আগে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।

রাতের যত্ন

দিনের ধুলো-ময়লা পরিষ্কার: রাতে ঘুমানোর আগে ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করুন, তবে কখনওই শক্ত করে ঘষবেন না।

মৃদু এক্সফোলিয়েশন (সপ্তাহে একদিন): সংবেদনশীল ত্বকের জন্য খুব হালকা এক্সফোলিয়েশন যথেষ্ট। এটি মৃত কোষ দূর করে, তবে অতিরিক্ত করলে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রাতের হাইড্রেশন: রাতে সিরাম ও ঘন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বক সারারাত নিজেকে রিপেয়ার করার সুযোগ পায়।

আরও পড়ুনঃ শিশুমন কি কেবলই দর্পণ, নাকি তার চেয়েও বেশি : জয়া মাহবুব

চোখের চারপাশের যত্ন: চোখের চারপাশের ত্বক খুব পাতলা হয়, তাই শীতে এখানে শুষ্কতা বেশি দেখা দেয়। প্রয়োজন হলে আলাদা আই ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন।

শীতের রুক্ষতায় সংবেদনশীল ত্বকের যত্নে আমার সেরা ৭টি পছন্দ

শীত মানেই ত্বক খসখসে হয়ে যাওয়া, আর যাদের ত্বক সংবেদনশীল তাদের জন্য এই সময়টা বেশ চ্যালেঞ্জিং। বাজারের সব প্রোডাক্ট সবার ত্বকে সহ্য হয় না। তাই বিভিন্ন জার্নাল এবং চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী এই শীতে আপনার স্কিনকেয়ার রুটিনে নিচের ৭টি উপাদান রাখতে পারেন।

১) হায়ালুরোনিক অ্যাসিড: এটি একটি শক্তিশালী হিউমেকট্যান্ট। যারা ভারী ক্রিম পছন্দ করেন না, তাদের জন্য এটি সেরা কারণ এটি নিজের ওজনের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি পানি ধরে রাখতে পারে, যা ত্বককে দেয় গভীর হাইড্রেশন।

২) সিরামাইড: আমাদের ত্বকের প্রাকৃতিক ব্যারিয়ার মজবুত করতে সিরামাইড অপরিহার্য। জার্নাল অফ কসমেটিক ডার্মাটোজি (২০২৩)-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সিরামাইড সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং বাইরের রুক্ষতা থেকে রক্ষা করতে দারুণ কার্যকর।

৩) গ্লিসারিন: খুব সাধারণ মনে হলেও, গ্লিসারিনের চেয়ে নিরাপদ ময়েশ্চারাইজার খুব কমই আছে। ব্রিটিশ জার্নাল অফ ডার্মাটোলজি’ এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গ্লিসারিন কেবল ত্বকের ওপর কাজ করে না, বরং এটি ত্বকের গভীর স্তর থেকে একুয়াপোরিন নামক চ্যানেলের মাধ্যমে পানির প্রবাহ সচল রাখে। ফলে ত্বক শুধু বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেও দীর্ঘক্ষণ হাইড্রেটেড থাকে এবং কোনো রকম ইরিটেশন ছাড়াই কাজ করে। সেনসিটিভ স্কিনে গ্লিসারিন সবসময় পানি বা ময়েশ্চারাইজারের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করুন, সরাসরি শুকনো ত্বকে লাগাবেন না।

৪) কোলয়েডাল ওটমিল: শীতে কি ত্বকে লালচে ভাব বা চুলকানি হয়? তাহলে ওটমিল আপনার জন্য আশীর্বাদ। এটি ত্বকের প্রদাহ কমায়। আপনি চাইলে ঘরেই ওটমিল গুঁড়ো করে মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ফেস মাস্ক: ওটমিল গুঁড়ো + কুসুম গরম পানি / দুধ / গোলাপজল, ১০–১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। শুষ্ক ও সেনসিটিভ স্কিনে কোলয়েডাল ওটমিল সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

৫) অ্যালোভেরা: এটি কেবল ত্বককে ঠান্ডাই রাখে না, বরং এর প্রাকৃতিক হিলিং প্রপার্টিজ ত্বকের শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকের অস্বস্তি কমাতে এর জুড়ি নেই।

৬) শিয়া বাটার: খুব বেশি ড্রাই স্কিন হলে শিয়া বাটার বেছে নিন। এটি ত্বকের ওপর একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, যা কনকনে ঠান্ডা বাতাস থেকে ত্বককে সুরক্ষা দেয় এবং ভেতর থেকে পুষ্টি জোগায়।

৭) মধু: রূপচর্চায় মধুর ব্যবহার যুগ যুগ ধরে। এটি প্রাকৃতিকভাবেই আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণের কারণে ত্বকের ছোটখাটো ইনফেকশন দ্রুত সেরে যায়। ১০ মিনিট কাঁচা মধু মুখে মেখে ধুয়ে ফেললে ত্বক তাৎক্ষণিক উজ্জ্বল ও নরম হয়।

মনে রাখবেন: সংবেদনশীল ত্বকে নতুন কোনো উপাদান সরাসরি ব্যবহারের আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করে নেওয়া জরুরি।

যে উপাদানগুলো এড়িয়ে চলবেন

সংবেদনশীল ত্বকের জন্য ফ্র্যাগরেন্সযুক্ত, অ্যালকোহলসমৃদ্ধ ও সালফেটযুক্ত প্রোডাক্ট ক্ষতিকর হতে পারে। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বা সুগন্ধিযুক্ত সাবান ত্বকের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট করে দেয়। তাই শীতে যতটা সম্ভব মাইল্ড ও ফ্র্যাগরেন্সমুক্ত প্রোডাক্ট ব্যবহার করুন।

শীতকালে সংবেদনশীল ত্বক আরও বেশি শুষ্ক, খসখসে ও জ্বালাপোড়াপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে সঠিক শীতকালীন রুটিন মেনে চললে ত্বককে সুস্থ ও আরামদায়ক রাখা সম্ভব। নিয়মিত সকাল ও রাতের যত্ন, সঠিক উপাদান নির্বাচন এবং ক্ষতিকর প্রোডাক্ট এড়িয়ে চলাই সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর ত্বকের চাবিকাঠি।

জয়া মাহবুব

শিশুমন কি কেবলই দর্পণ, নাকি তার চেয়েও বেশি : জয়া মাহবুব 

Previous article

বিষাক্ত বাতাসে বন্দি ঢাকা : যখন নিঃশ্বাস নেওয়াই ঝুঁকির কারণ

Next article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *