ই-কমার্সউদ্যোক্তার গল্পদেশি উদ্যোক্তা

নারী উদ্যোক্তা : সহানুভূতির দেয়াল ভেঙ্গে যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রয়োজন – জয়া মাহবুব 

1
j2

বিশ্বের অর্থনীতিতে নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে, তবুও তাদের সাফল্যকে এখনো এক প্রকার বিস্ময়ের চোখে দেখা হয়। যেন তারা ব্যবসার মাঠে পা রাখলেই সেটি কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা, আর কেউ যদি তাদের পাশে দাঁড়ায়, সেটিকে ‘সহায়তা’ বা ‘দয়া’র চেয়ে বেশি কিছু বলে ভাবা হয় না। এখানেই সমস্যার মূল। নারী উদ্যোক্তারা দয়া বা কৃপা গ্রহণ করতে বাজারে আসেন না—তারা আসেন দক্ষতা, পরিশ্রম এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের প্রাপ্য ন্যায্য অংশ দাবি করতে।

একজন নারী যখন ব্যবসা শুরু করেন, সমাজের প্রথম প্রশ্নটি হয়—তিনি পারবেন কি না। বিপরীতে, একজন পুরুষ একই সিদ্ধান্ত নিলে প্রশ্ন হয়—তিনি কতদূর যেতে পারেন। বিচার–বিবেচনার এই অদৃশ্য অসমতা নারী উদ্যোক্তাদের যাত্রাকে শুরু থেকেই কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে। এই বৈষম্য কেবল সামাজিক নয়, বরং অত্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক।

বিশ্বখ্যাত ডাটা প্ল্যাটফর্ম ক্রাঞ্চবেস -এর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী মোট স্টার্টআপ ফাণ্ডিং বা ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাত্র ২.৩% নারী–নেতৃত্বাধীন ব্যবসার হাতে ওঠে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অন্ধত্বের প্রতিফলন। এটি প্রমাণ করে যে, নারী উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা বা নেতৃত্ব এখনো আমাদের বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যবস্থায় পুরোপুরি ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হয়ে ওঠেনি।

অনেকে মনে করেন নারীদের সফল হতে বিশেষ কোনো ‘ছাড়’ প্রয়োজন। কিন্তু সত্যি কথা হলো—নারীরা বাড়তি সুবিধা নয়, বরং ন্যায্য সুযোগ চান। যেখানে সুযোগ সমান, সেখানে প্রতিযোগিতা স্বচ্ছ হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীরা চরম প্রতিকূলতা এবং সীমিত পুঁজি নিয়েও পুরুষদের তুলনায় অনেক সময় বেশি সাফল্যের পরিচয় দেন।

আরও পড়ুনঃ নারী উদ্যোক্তাদের অদৃশ্য যুদ্ধ, ইমোশনাল লেবারের দাম কে দেবে : জয়া মাহবুব

বোস্টন কন্সাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি) এবং ম্যাসচ্যালেঞ্জ -এর একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বিনিয়োগকৃত প্রতি ১ ডলারের বিপরীতে নারী-চালিত স্টার্টআপগুলো গড়ে ৭৮ সেন্ট আয় করে, যেখানে পুরুষ-চালিত স্টার্টআপগুলোর আয় মাত্র ৩১ সেন্ট। অর্থাৎ, নারীরা পুঁজি ব্যবহারে অধিকতর দক্ষ এবং দ্বিগুণ রিটার্ন দিতে সক্ষম।

উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে এই লড়াই আরও কঠিন। সমাজের পূর্বধারণা, পরিবারের গুরুভার এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলা করেই তাদের এগোতে হয়। তবুও তারা পিছিয়ে থাকেন না, কারণ তারা জানেন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার একমাত্র পথ। বিসিজি-র তথ্যমতে, যদি বিশ্বের নারী ও পুরুষ সমানভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পেতেন, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত জিডিপি যোগ হতে পারত।

নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্যকে ‘স্পেশাল কেস’ হিসেবে দেখার প্রবণতা এখন বন্ধ করা উচিত। একজন নারী যখন বাজারে পা রাখেন, তিনি কোনো সহানুভূতির পাত্রী নন—তিনি কেবল একজন উদ্যোক্তা। তার সাফল্য যেমন তার যোগ্যতার প্রমাণ, তার ব্যর্থতাও উদ্যোক্তা জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ; এখানে লিঙ্গের কোনো ভূমিকা নেই। নারীরা কেবল ব্যক্তিগত মুনাফার কথা ভাবেন না; গবেষণায় দেখা গেছে, তারা তাদের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ সমাজ ও পরিবারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় করেন।

এখন সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। নারী উদ্যোক্তারা কারো উপকারের ফলাফল নন। তারা সক্ষমতা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামেন এবং সমান সুযোগ পেলে তারা অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, অর্থনীতিতে নারীর এই অংশগ্রহণ কোনো করুণা নয়, বরং এটি একটি জাতির টিকে থাকার এবং সমৃদ্ধ হওয়ার অপরিহার্য শর্ত। নারীরা ব্যবসার জগতে যা চাইছেন, তা খুব সহজ: ন্যায্যতা, সমতা এবং সম্মান। তাদের প্রয়োজন কেবল একটি বাধামুক্ত পরিবেশ, কোনো দয়া বা উপকার নয়।

জয়া মাহবুব

জেসিআই বাংলাদেশ’র রিজিওনাল ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন সামিয়া রহমান

Previous article

র‍্যাকের নতুন সভাপতি শাফি, সাধারণ সম্পাদক তাবারুল, দপ্তর সম্পাদক মাসুদ রানা

Next article

You may also like

1 Comment

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *