জীবনযাপন

আধুনিক দাম্পত্য জীবনের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব : জয়া মাহবুব

2
Photo Of Azad and Tasmia 1

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্ম এখন শুধু বন্ধু বা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম নয়, দাম্পত্য জীবনে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এই প্রভাব ইতিবাচকও হতে পারে, আবার নেতিবাচকও।

ইতিবাচক প্রভাব

যোগাযোগের সহজ মাধ্যম: সারাদিন ব্যস্ততার মাঝেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে স্বামী–স্ত্রী একে অপরকে খোঁজ নিতে পারেন। একটি ছোট মেসেজ বা ভিডিও কল মানসিক দূরত্ব কমায়।

স্মৃতি ভাগাভাগি: ভ্রমণ, জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকীর মতো বিশেষ মুহূর্ত ছবি বা ভিডিও আকারে ভাগ করলে সম্পর্ক আরও সুন্দরভাবে প্রকাশ পায় এবং স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে।

প্রশংসা ও সমর্থন: একে অপরকে অনলাইনে প্রশংসা করা বা অর্জনগুলো শেয়ার করা দাম্পত্য জীবনে ইতিবাচক আবেগ সৃষ্টি করে।

সৃজনশীলতা ভাগাভাগি: কবিতা, ছবি, রান্না বা অন্য কোনো প্রতিভা সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করলে স্বামী–স্ত্রী একে অপরের সৃজনশীলতাকে আরও মূল্যায়ন করতে শেখেন।

পারিবারিক বন্ধন মজবুত করা: একে অপরের পরিবার–পরিজনের পোস্টে অংশগ্রহণ করলে পারস্পরিক সম্মান ও সম্পর্ক আরও গভীর হয়।।

ইতিবাচক অনুপ্রেরণা: ধর্মীয় বা শিক্ষামূলক কনটেন্ট একে অপরকে শেয়ার করলে মানসিক উন্নতি ঘটে এবং দাম্পত্য সম্পর্কে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়।

Photo Of Azad and Tasmia 1

মডেল: মোঃ আজাদ হোসেন এবং তাসমিয়া তাবাসসুম

নেতিবাচক প্রভাব

যোগাযোগের ভাঙন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে সরাসরি কথোপকথন কমে যাচ্ছে। আগে যেখানে দিনের শেষে একসাথে বসে গল্প হতো, এখন সেখানে দু’জনই আলাদা করে মোবাইলে ডুবে থাকেন। এতে বোঝাপড়া দুর্বল হয়, ছোট ছোট সমস্যা জমে বড় হয়ে যায়, আর ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। অনেক সময় অনলাইন যোগাযোগ অফলাইন অনুভূতির ঘাটতি পূরণ করতে পারে না।

অন্যের জীবনের সাথে তুলনা: সোশ্যাল মিডিয়ায় সব সময় অন্যদের সাজানো-গোছানো জীবন দেখতে দেখতে নিজেদের সম্পর্ককে ছোট বা কম সুখী মনে হয়। যেমন—অন্য দম্পতির ঘুরতে যাওয়া, দামী উপহার দেওয়া বা ছবি দেখে নিজের সঙ্গীকে নিয়ে হতাশা জন্মায়। এই অযথা তুলনা দাম্পত্য সম্পর্কে অস্বস্তি, চাপ এবং অকারণ অসন্তুষ্টি তৈরি করে।

আবেগের দূরত্ব: সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানোর কারণে বাস্তব জীবনের আবেগী সংযোগে ফাঁক দেখা দেয়। প্রয়োজনের সময় সঙ্গীর মনোযোগ না পাওয়া বা বারবার ফোনে ব্যস্ত থাকা আবেগে আঘাত করে, যা ধীরে ধীরে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে।

অবিশ্বাস ও সন্দেহ: সোশ্যাল মিডিয়ার কোন বন্ধুর সাথে যদি বেশি কথা বা মেসেজ করা হয়, এসব নিয়ে সঙ্গীর মনে সন্দেহ জন্ম নিতে পারে। আরেকজনকে অনলাইনে বেশি গুরুত্ব দিলে সঙ্গীর মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। এই অবিশ্বাস সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু।

সমাধান ও ভারসাম্য

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি খারাপ নয়, তবে এর ব্যবহার সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই মূল বিষয়। স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্কে ভালোবাসা ও বোঝাপড়া টিকিয়ে রাখতে কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি—

সময়ের সঠিক ব্যবহার: দিনের নির্দিষ্ট সময়ে ফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থেকে শুধু একে অপরের জন্য সময় বের করা দরকার। যেমন—খাওয়ার সময় বা রাতে ঘুমানোর আগে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা। এতে যোগাযোগ বাড়ে, সম্পর্কও গভীর হয়।

আরও পড়ুনঃ যদি নিজে কিছু করতে চান–নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ : জয়া মাহবুব

খোলামেলা আলোচনা: স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হলো একটি সুস্থ সম্পর্কের মূলভিত্তি। আজকের যুগে অনলাইনে কোন ছবি, তথ্য বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত শেয়ার করা যাবে আর কোনটা গোপন থাকবে—এ নিয়ে আগে থেকেই আলাপ করা খুব জরুরি। এতে একদিকে পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যায়। যদি সঙ্গী মনে করেন, কিছু বিষয় কেবল দুজনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, তাহলে সেই অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ, খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হওয়া বোঝাপড়া সম্পর্ককে আরও নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

আস্থা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা: লুকিয়ে কিছু না করে খোলামেলা আচরণ করলে অবিশ্বাস জন্মায় না। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও সেটা নিয়ে খোলাখুলি বলা সঙ্গীকে নিরাপদ বোধ করায়।

অতিরিক্ত তুলনা এড়ানো: অন্যের জীবনের সাথে নিজের জীবন মেলানো উচিত নয়। মনে রাখতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই তাদের সুন্দর দিকটাই বেশি দেখায়। বাস্তব সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়াই সুখের চাবিকাঠি।

মানসিক সংযোগকে প্রাধান্য দেওয়া: অনলাইনে যত ব্যস্তই থাকি না কেন, আবেগিক প্রয়োজনের সময় সঙ্গীর পাশে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ভার্চুয়াল ইমোজি নয়, বাস্তব অনুভূতির প্রকাশই সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আধুনিক দাম্পত্য জীবনের জন্য একদিকে আশীর্বাদ, আবার অন্যদিকে অভিশাপও হতে পারে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি ভালোবাসা ও বোঝাপড়া বাড়ায়, আর অপব্যবহার করলে দূরত্ব ও অবিশ্বাস তৈরি করে। তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে অনলাইন আর অফলাইন জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

—জয়া মাহবুব

ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত জীবনে সোশ্যাল প্রুফের প্রভাব : এলিন মাহবুব

Previous article

ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধে জিরো টলারেন্স : মহাপরিচালক

Next article

You may also like