ই-কমার্সমতামত উদ্ভাবনের নতুন রসায়ন : পণ্যকে অর্থবহ করতে কেন প্রয়োজন ‘কগনিটিভ ফ্রিকশন’ By নিজস্ব প্রতিবেদক April 19, 20261 ShareTweet 1 আজকের গ্লোবাল ইকোনমির মূলমন্ত্র হলো ‘সিম্পলিসিটি’ বা সরলতা। সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে ঢাকার স্টার্টআপ সবখানেই উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য একটাই: গ্রাহকের জীবন থেকে সবটুকু ‘ফ্রিকশন’ বা বাধা সরিয়ে ফেলা। অ্যাপের এক ক্লিকে খাবার, এক টাচে রাইড, আর এআই-এর মাধ্যমে মুহূর্তেই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু এই সবকিছু অতিরিক্ত সহজ করে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় আমরা কি ব্র্যান্ডের সাথে গ্রাহকের মানসিক সংযোগটিই হারিয়ে ফেলছি? আচরণগত বিজ্ঞানের একটি চমকপ্রদ ধারণা হলো ‘আইকিয়া ইফেক্ট’। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সেই বস্তুটিকে বেশি মূল্যবান মনে করে যা তৈরিতে তার নিজের শ্রম বা সময় ব্যয় হয়েছে। এই যে সামান্য একটু শ্রম বা ‘কগনিটিভ ফ্রিকশন’, এটাই গ্রাহকের অবচেতন মনে পণ্যটির প্রতি এক গভীর মমত্ববোধ ও আনুগত্য তৈরি করে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: যখন ‘সহজ’ মানেই ‘অস্থায়ী’ বিশ্বজুড়ে এখন দেখা যাচ্ছে যে, যেসব কোম্পানি কেবল সুবিধার ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল, তারা দ্রুত বাজার হারাচ্ছে। কারণ, সুবিধা মানুষকে অলস করে এবং বিকল্প খোঁজার সুযোগ দেয়। আপনার সার্ভিস যদি কেবল ‘সহজ’ হওয়ার কারণেই কেউ ব্যবহার করে, তবে কাল যখন অন্য কোনো গ্লোবাল জায়ান্ট আরও সহজ উপায় নিয়ে আসবে, গ্রাহক নিমিষেই আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে। কারণ সেখানে কোনো ‘ইমোশনাল ইনভেস্টমেন্ট’ বা মানসিক বিনিয়োগ নেই। উদাহরণস্বরূপ, অনেক প্রিমিয়াম কফি ব্র্যান্ড এখন কফি তৈরির পুরো কিট বিক্রি করে, যেখানে গ্রাহককে নিজেই কফি বিন পিষে কাপ তৈরি করতে হয়। এটি কেবল কফি খাওয়া নয়, বরং একটি ‘রিচুয়াল’ বা আচারে পরিণত হয়। এই পরিকল্পিত শ্রমটুকুই গ্রাহককে ওই ব্র্যান্ডের সাথে দীর্ঘ মেয়াদে বেঁধে রাখে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের বাজার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে পাঠাও, ফুডপান্ডা বা চাল-ডালের মতো সার্ভিস আমাদের জীবন সহজ করছে, অন্যদিকে দেশি অনেক ব্র্যান্ড কেবল ডিসকাউন্ট যুদ্ধের কারণে টিকে আছে। আমাদের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মনে রাখা প্রয়োজন, এদেশের মানুষের আবেগ ও শ্রমের মূল্য অনেক বেশি। হস্তশিল্প ও দেশি পণ্যের শিক্ষা: বাংলাদেশের নকশিকাঁথা বা জামদানির প্রতি আমাদের যে টান, তার বড় কারণ হলো এর পেছনের হাড়ভাঙা খাটুনির গল্প। গ্রাহক যখন জানে এই পণ্যটির পেছনে শ্রম আছে, তখন তার কদর বেড়ে যায়। আরও পড়ুনঃ যখন জীবন কারো জন্য অপেক্ষা করে না কো ক্রিয়েশন: আমাদের দেশের ফুড বা লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডগুলো গ্রাহককে কেবল ‘ভোক্তা’ না বানিয়ে ‘নির্মাতা’ বানাতে পারে। যেমন—রান্নার কিট বা হোম-ডেকর পণ্য, যেখানে গ্রাহক নিজের সৃজনশীলতা ব্যবহারের সুযোগ পাবে। ধরুন, আপনি ফ্রোজেন ফুড বিক্রি করছেন। সবটুকু তৈরি করে না দিয়ে যদি এমন একটি মসলার মিশ্রণ বা ‘ফিনিশিং টাচ’ গ্রাহকের হাতে ছেড়ে দেন যা তাকে করতে হবে, তবে রান্নার শেষে তার মনে হবে—”এটি আমার তৈরি’। তাছাড়া অ্যাপের ইন্টারফেস এমন হতে পারে যেখানে গ্রাহক নিজের প্রয়োজন মতো অপশন সাজিয়ে নিতে পারে। এই যে নিজের মতো করে কিছু করার সুযোগ, এটিই হলো ‘পরিকল্পিত বাধা’ বা কগনিটিভ ফ্রিকশন। ভারসাম্যই আসল শক্তি উদ্ভাবনের অর্থ এই নয় যে, আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে পেমেন্ট গেটওয়ে বা ডেলিভারি সিস্টেমকে জটিল করে দেব। লেনদেন হতে হবে পানির মতো মসৃণ, কিন্তু পণ্যের অভিজ্ঞতা হতে হবে অংশগ্রহণমূলক। উদ্যোক্তাদের বুঝতে হবে ঠিক কোথায় ‘পরিকল্পিত বাধা’ কমাতে হবে আর কোথায় তা বাড়াতে হবে। আর এখানেই প্রয়োজন ‘সিস্টেম-বেসড লিডারশিপ’ বা পদ্ধতি-নির্ভর নেতৃত্ব। যিনি প্রকৃত নেতৃত্বের মর্ম বোঝেন, তিনি ব্যবসা পরিচালনার জন্য কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ওপর নির্ভর করেন না; বরং তিনি এমন এক অনন্য ‘সিস্টেম’ বা কাঠামো গড়ে তোলেন যা মানুষের মনস্তত্ত্বকে ধারণ করতে পারে। এই সিস্টেমের সার্থকতা এখানেই যে, এটি গ্রাহককে কেবল একজন সাধারণ ক্রেতা হিসেবে বিদায় দেয় না, বরং পণ্যের প্রতিটি স্তরে তাকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করে এক অবিচ্ছেদ্য অভিজ্ঞতার অংশীদার করে তোলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রাহক এখন আর কেবল ‘কনজিউমার’ বা সাধারণ ভোক্তা হয়ে থাকতে চায় না, তারা ‘মেকার’ বা নির্মাতা হতে চায়। বিশেষ করে বর্তমানের ‘জেন-জি’ প্রজন্মের ক্রেতাদের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা কোনো পণ্য কেবল ব্যবহারের জন্য কেনে না; তারা চায় সেই পণ্যের মাধ্যমে নিজেদের স্বকীয়তা প্রকাশ করতে। এই প্রজন্মের কাছে ‘অফ-দ্য-শেল্ফ’ বা গৎবাঁধা পণ্যের চেয়ে সেই পণ্যের মূল্য বেশি, যেখানে তাদের নিজস্ব সিগনেচার বা ব্যক্তিগত ছোঁয়া রাখার সুযোগ থাকে। তারা চায় ব্র্যান্ডের সাথে একটি সক্রিয় সংলাপে জড়াতে, যেখানে তাদের মতামত এবং সৃজনশীলতার গুরুত্ব থাকবে। যখন কোনো ব্যবসা বা নেতৃত্ব একটি মজবুত সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রাহকের সেই সামান্য শ্রম ও সৃজনশীলতাকে সম্মান দেয়, তখন সেটি আর কোনো সাধারণ লেনদেন থাকে না। গ্রাহকের এই ‘কো-ক্রিয়েশন’ বা সহ-নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে যখন একটি ব্যবসায়িক কাঠামো ধারণ করতে পারে, তখনই জন্ম নেয় এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী আনুগত্য। এটি আর কেবল কেনাবেচার সম্পর্ক নয়, বরং একটি যৌথ যাত্রায় পরিণত হয়। ভবিষ্যতের সফল উদ্যোক্তা তিনি হবেন না যিনি কেবল মানুষের জীবন রোবটের মতো সহজ করবেন, বরং তিনি হবেন যিনি জীবনকে অর্থবহ করবেন। সহজলভ্যতার এই জোয়ারে মাঝে মাঝে একটু কষ্ট করে অর্জন করা জিনিসগুলোই আমাদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। ঘাম না ঝরলে যেমন সাফল্যের স্বাদ পাওয়া যায় না, তেমনি শ্রম বিনিয়োগ ছাড়া ব্র্যান্ডের প্রতি ভালোবাসাও তৈরি হয় না। বিশ্ববাজার বা স্থানীয় বাজার,জয়ী তারাই হবে যারা গ্রাহককে কেবল সুবিধা নয়, বরং গর্ব করার মতো একটি অভিজ্ঞতা উপহার দেবে। -জয়া মাহবুব
ই-ক্যাব ইয়ুথ ফোরামের হাত ধরে শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে ই-কমার্স ক্লাবের February 8, 20232342 views