স্বাস্থ্য এইচআইভি আক্রান্তদের জীবন : অদৃশ্য দেয়াল ও সামাজিক নিগ্রহের বিষাদ By নিজস্ব প্রতিবেদক December 1, 20250 ShareTweet 0 এইচআইভি সংক্রমণ এখন আর মারণ রোগ নয়, সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে এই ভাইরাস বহনকারী মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চিকিৎসা নয়, বরং সমাজের চোখে ‘কলঙ্ক’ আর প্রতিনিয়ত চলা সামাজিক বৈষম্য। কুসংস্কার, ভ্রান্ত ধারণা এবং অজ্ঞতার কারণে আক্রান্তদের জীবন, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অদৃশ্য দেয়ালের মতো কঠিন হয়ে উঠছে। ১) আক্রান্তদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও স্টিগমা বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস আক্রান্তদের (People Living with HIV – PLHIV) প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গভীর শিকড় গেড়ে আছে। বহু মানুষ এখনো মনে করেন, এটি শুধুমাত্র ‘অনৈতিক’ জীবনযাপনের ফল। তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী- ভ্রান্ত ধারণা: সাধারণ জনগণের মধ্যে এখনো এই ভ্রান্ত ধারণা প্রবল যে, আক্রান্তদের স্পর্শ করলে বা তাদের ব্যবহৃত জিনিস ব্যবহার করলে এইচআইভি ছড়াতে পারে, যদিও ভাইরাসটি শুধুমাত্র অরক্ষিত যৌন মিলন, দূষিত রক্ত, ব্যবহৃত সূঁচ ভাগ করে নেওয়া এবং মা থেকে শিশুর মধ্যে (গর্ভাবস্থা, প্রসব, বা স্তন্যপান) ছড়ায়। একঘরে হওয়া: আক্রান্তের খবর জানাজানি হলে পরিবার ও প্রতিবেশীরা তাদের এড়িয়ে চলেন বা একঘরে করে দেন। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত হওয়ার কারণে অনেককে নিজ এলাকা বা বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছে। দায়ভার: বিশেষ করে নারীরা, যারা প্রবাসী স্বামীর মাধ্যমে কিংবা অন্য কোনোভাবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাদেরই সমাজে বেশি দোষারোপ করা হয় এবং তারা সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের শিকার হন। ২) কর্মসংস্থান, পরিবার ও শিক্ষায় বৈষম্য এই সামাজিক স্টিগমা জীবনধারণের মূল ক্ষেত্রগুলোতে ভয়াবহ বৈষম্য তৈরি করে। কর্মসংস্থান হারানো: এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার খবর প্রকাশ পেলে বহু মানুষ কাজ হারান। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীরা তাদের এড়িয়ে চলেন বা কর্তৃপক্ষ সরাসরি চাকরিচ্যুত করে। এর ফলে আক্রান্তদের জীবনধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং তাদের দারিদ্র্যের শিকার হতে হয়। পরিবারে প্রত্যাখ্যান: অনেক ক্ষেত্রে, এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। স্বামী বা স্ত্রী কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়া, এমনকি বাবা-মা বা সন্তানেরা দূরে সরে যাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। শিক্ষায় বাধা: আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়া বা সহপাঠীদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সাথে মিশতে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। এটি শিশুদের মানসিক বিকাশে চরম বাধা সৃষ্টি করে। আরও পড়ুনঃ “টেস্টিং বাড়লেও অনেক রোগী ‘অদৃশ্য’—এইডসে বাংলাদেশে নতুন অ্যালার্ম” স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য: দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরাও (চিকিৎসক, নার্স) বৈষম্যমূলক আচরণ করেন। তারা আক্রান্তদের কাছ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলেন, যা তাদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক ধারণাকে আরও মজবুত করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীও রোগীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেন, যা চিকিৎসার পথে বড় বাধা। ৩) মানসিক স্বাস্থ্য সংকট সামাজিক বর্জন ও বৈষম্য এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে গভীর মানসিক সংকট সৃষ্টি করে। আত্মগোপন ও চিকিৎসা বিমুখতা: লোকলজ্জা ও বৈষম্যের ভয়ে অনেকে তাদের রোগ গোপন রাখেন। ফলে তারা সময়মতো পরীক্ষা বা চিকিৎসা নিতে দ্বিধা করেন, যা রোগের বিস্তার এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আক্রান্তদের একটি বড় অংশ এখনও চিকিৎসার বাইরে রয়েছে। একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা: সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পরিবার ও বন্ধুর অভাব এবং জীবনধারণের অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে তীব্র একাকীত্ব, বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগ সৃষ্টি করে। মানবাধিকার লঙ্ঘন: বৈষম্যের কারণে তাদের মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়। সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হন। ৪) সরকারের উদ্যোগ ও করণীয় সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য এইচআইভি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সেবা প্রদানে কাজ করছে। তবে স্টিগমা দূর করতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। আইনি সুরক্ষা: এইচআইভি আক্রান্তদের জন্য কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য দূর করতে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। সচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে এইচআইভি সংক্রমণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার করতে হবে। ‘অদৃশ্য = অসংক্রামক’ (Undetectable = Untransmittable বা U=U) এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন, যার অর্থ হলো—সঠিক চিকিৎসায় ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে থাকলে তা অন্যের দেহে ছড়ায় না। কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তা: আক্রান্তদের এবং তাদের পরিবারের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এইচআইভি আক্রান্তদের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল থেরাপি (ART) যতটা জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি সামাজিক সহযোগিতা ও বৈষম্যমুক্ত পরিবেশ। কলঙ্কমুক্ত সমাজই পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হতে। মো. মাসুদুজ্জামান
এইডস প্রতিরোধে বাংলাদেশ : ‘মৃদু আক্রান্তের দেশ’ থেকে নির্মূলের পথে সরকারের কৌশল November 29, 202587 views
ই-ক্যাব ইয়ুথ ফোরামের হাত ধরে শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে ই-কমার্স ক্লাবের February 8, 20231972 views