স্বাস্থ্য

এইচআইভি/এইডস নির্মূলের পথে বাংলাদেশ, তবুও ‘লুকানো’ চ্যালেঞ্জ!

1
hiv 5

বাংলাদেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার ০.০১ শতাংশের নিচে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে অত্যন্ত কম। কিন্তু শিরায় মাদক গ্রহণকারী, যৌনকর্মী, পুরুষ সমকামী এবং হিজড়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে বেশি। এছাড়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং বিদেশ ফেরত প্রবাসী ও তাদের পরিবারও ঝুঁকির নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস নির্মূলের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও নতুন কৌশল অবলম্বন করা অপরিহার্য।

বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত

সংক্রমণের হার: সাধারণ জনগণের মধ্যে <০.০১%।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী: ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী (আইডিইউ), নারী যৌনকর্মী, পুরুষ সমকামী (এমএসএম) এবং তৃতীয় লিঙ্গ (হিজড়া) – এদের মধ্যে সংক্রমণ হার বেশি।

নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র: রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসীরা (বিদেশ ফেরত প্রবাসী)।

সচেতনতার ঘাটতি: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীই এইডস সম্পর্কে অবগত নন।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

১) এনজিও ও সিএসওগুলোর ভূমিকা: সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দিতে হবে

এনজিও এবং সিএসও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি প্রতিরোধমূলক সেবা, যেমন: ড্রপ ইন সেন্টার (DIC) পরিচালনা, সচেতনতা তৈরি, কনডম বিতরণ, এবং কাউন্সেলিং-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

করণীয়

সেবার মান উন্নয়ন: ঝুঁকি বিবেচনা করে এই বিশেষায়িত সেবাকেন্দ্র বা DIC-গুলোর কার্যক্রমের মান এবং ব্যবস্থাপনা সময়োপযোগী করা।

সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব: এ বছর বিশ্ব এইডস দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Let Communities Lead’। এর অর্থ হলো, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকেই নেতৃত্ব তৈরি করে প্রতিরোধ কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করা।

স্বাস্থ্যসেবা সমন্বয়: বেসরকারি সেবাকে সরকারি বিস্তৃত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করা।

২) জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে মিডিয়ার করণীয়: কুসংস্কার ভাঙার লড়াই

এইচআইভি/এইডস নিয়ে সমাজে এখনো প্রবল কুসংস্কার এবং বৈষম্য বিদ্যমান। সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক আক্রান্ত ব্যক্তিও লোকলজ্জার ভয়ে সেবা নিতে আসেন না।

করণীয়

প্রভাবশালী প্রচার: প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে এইচআইভি সংক্রমণ এবং প্রতিরোধের সঠিক বার্তাটি সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে হবে।

বয়সভিত্তিক শিক্ষা: তরুণ ও যুবসমাজকে লক্ষ্য করে জীবন-দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষা এবং সঠিক যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য প্রচার করা।

নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন: এইডস যে ছোঁয়াচে রোগ নয়, এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু উপায়ে ছড়ায়—এই বিষয়ে বারবার প্রচার চালিয়ে কুসংস্কার দূর করা এবং আক্রান্তদের প্রতি সহমর্মিতা বাড়ানো।

৩) সায়েন্স ও টেকনোলজির সম্ভাবনা: আধুনিক সমাধানের পথে

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনী ব্যবহার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

করণীয়

সম্প্রসারণ: বর্তমানে বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা শুধুমাত্র ১১টি সরকারি হাসপাতালে সীমিত। ভবিষ্যতে দেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সদর হাসপাতালে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে।

স্ক্রিনিং সুবিধা: দেশের সব সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র, বিমানবন্দর, নৌবন্দর ও স্থলবন্দরে উন্নত স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা রাখা।

Pre-Exposure Prophylaxis (PrEP): অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য PrEP-এর মতো আধুনিক প্রতিরোধমূলক কৌশলগুলো সরকারি উদ্যোগে সহজলভ্য করার জন্য পাইলট প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে।

গোপনীয়তা রক্ষা: অ্যাপ-ভিত্তিক বা ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে এইচআইভি পরীক্ষা ও ফলাফল জানার ব্যবস্থা উন্নত করা, যাতে রোগীর তথ্য ও গোপনীয়তা সর্বোচ্চভাবে রক্ষা হয়।

সুপারিশ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা

২০৩০ সালের মধ্যে এইডস নির্মূলের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া এবং সাধারণ জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সমন্বয় ও মনিটরিং: জাতীয় এইডস/এসটিডি প্রোগ্রামকে অবশ্যই সকল অংশীদার সংস্থা এবং কার্যক্রমগুলোর মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

মানসম্মত প্রশিক্ষণ: স্বাস্থ্যকর্মী ও সেবা প্রদানকারীদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, যাতে তারা বৈষম্যহীনভাবে সেবা দিতে পারে।

অভিবাসী প্রশিক্ষণ: বিদেশ যাত্রার আগে এবং পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের জন্য এইচআইভি প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা জরুরি।

চূড়ান্ত কথা হলো, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিগুলোর সুষম বিস্তার এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা ও সাহস সৃষ্টিই পারে বাংলাদেশকে এইচআইভি মহামারীর বিরুদ্ধে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে।

মো. মাসুদুজ্জামান

এইচআইভি আক্রান্তদের জীবন : অদৃশ্য দেয়াল ও সামাজিক নিগ্রহের বিষাদ

Previous article

এইডস সংক্রমণে নতুন রেকর্ড, গত এক বছরে আক্রান্ত ১৩ লাখ : ডব্লিউএইচও

Next article

You may also like

1 Comment

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *