উদ্যোক্তার গল্পদেশি উদ্যোক্তাপ্রকৃতি ও পরিবেশ

টিফিনের টাকায় শুরু, স্বপ্ন এক সবুজ বাংলাদেশ

0
ujj 1

একটি গাছের চারা। দাম হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু সেই ছোট্ট চারাটিই কখনো কখনো একজন মানুষের জীবনের দর্শন হয়ে উঠতে পারে। স্কুলজীবনে টিফিনের টাকা জমিয়ে গাছের চারা কিনতেন তিনি। বন্ধুরা যখন টিফিন খেত, তখন তিনি রাস্তার পাশে, স্কুলের মাঠে কিংবা খালি জমিতে নিঃশব্দে একটি করে গাছ লাগিয়ে দিতেন।

আজ সেই ছোট্ট উদ্যোগ রূপ নিয়েছে এক দীর্ঘ সবুজ আন্দোলনে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কাজ করে চলেছেন পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির গাছ রক্ষায়। দেশের ৬৪ জেলায় বিনামূল্যে বৃক্ষ বিতরণ ও পরিবেশ সচেতনতা তৈরির উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার বার্তা।

সমালোচনা, উপহাস, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা জীবনের ঝুঁকি, কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। কখনো গভীর রাতে মাথায় করে বিরল গাছের চারা বহন করেছেন, কখনো বন্য হাতির মুখোমুখি হয়েও ফিরে আসেননি তার স্বপ্ন থেকে।

প্রকৃতিকে শুধু ভালোবাসা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়েই এগিয়ে চলেছেন পরিবেশকর্মী মাহবুবুল ইসলাম পলাশ। তার দীর্ঘ পথচলা, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় তুলে ধরেছেন জয়া মাহবুব।

আপনি যখন প্রথমবার গাছ ও পরিবেশ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, সেই সময়ের এমন কোনো ব্যক্তিগত ঘটনা বা মুহূর্ত আছে কি, যেটি আপনার চিন্তা ও জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল?

ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি, গাছপালা আর সবুজের প্রতি আমার এক অন্যরকম ভালোবাসা ছিল। গ্রামের খোলা মাঠ, পাখির ডাক, বড় বড় ছায়াঘেরা গাছ এসবের মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি দেখলাম, আমাদের আশপাশের সেই পরিচিত গাছগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। যেসব গাছের নিচে আমরা খেলতাম, গল্প করতাম, বিশ্রাম নিতাম সেগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে নানা কারণে। তখন হয়তো ছোট ছিলাম, কিন্তু ভেতরে একটা কষ্ট কাজ করত। মনে হতো, আমরা শুধু গাছ কাটছি না, আমাদের শৈশব, প্রকৃতি আর ভবিষ্যৎও হারিয়ে ফেলছি।

২০০০ সাল থেকে আমি নিয়মিতভাবে পরিবেশ, প্রকৃতি ও বৃক্ষরোপণ নিয়ে কাজ শুরু করি। তখন আমি স্কুলে পড়তাম। খুব বেশি সামর্থ্য ছিল না, কিন্তু ইচ্ছেটা ছিল প্রবল। আমি স্কুলের টিফিনের টাকা জমিয়ে গাছের চারা কিনতাম। অনেক সময় বন্ধুরা টিফিন খেত, আর আমি সেই টাকা দিয়ে ছোট ছোট গাছ কিনে রাস্তার পাশে, স্কুল প্রাঙ্গণে কিংবা খালি জায়গায় রোপণ করতাম।

কেউ কেউ বিষয়টা দেখে হাসত, কেউ বলত, “এই গাছ লাগিয়ে কী হবে?” কিন্তু আমি ভেতর থেকে অনুভব করতাম, একদিন এই ছোট ছোট গাছই বড় হয়ে মানুষকে ছায়া দেবে, অক্সিজেন দেবে, পাখির আশ্রয় হবে।

একদিন প্রচণ্ড গরমে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আশপাশে কোথাও ছায়া ছিল না। তখন একটি বড় গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াতেই শরীর ও মনে এক ধরনের শান্তি অনুভব করি। সেদিন উপলব্ধি করি একটি গাছ শুধু পরিবেশ সুন্দর করে না, মানুষের জীবনও রক্ষা করে। সেই মুহূর্তটি আমার চিন্তাধারাকে পুরোপুরি বদলে দেয়।

ধীরে ধীরে গাছ লাগানো আমার অভ্যাস থেকে দায়িত্বে পরিণত হয়। আমি বুঝতে শিখি, প্রকৃতি বাঁচানো মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়; এটি মানুষের ভবিষ্যৎ, জীববৈচিত্র্য এবং পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। সেই বিশ্বাস থেকেই আজও আমি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি, যেন আগামী প্রজন্ম একটি সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী পায়।

এই পরিবেশ আন্দোলনের শুরুতে পরিবার, বন্ধু বা আশপাশের মানুষ আপনার কাজকে কীভাবে দেখেছিল? কখনো কি নিরুৎসাহিত হতে হয়েছিল?

আমার পরিবেশ ও বৃক্ষরোপণের কাজের শুরুর সময়টা মোটেও সহজ ছিল না। আজ মানুষ যেভাবে উৎসাহ দেয়, শুরুতে পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। তখন গ্রামের অনেক মানুষই আমার কাজকে অদ্ভুতভাবে দেখত। কেউ বুঝতে পারত না কেন আমি এত সময়, শ্রম আর ভালোবাসা গাছের পেছনে দিচ্ছি।

অনেকে সরাসরি আমাকে “পাগল” বলত। কেউ হাসাহাসি করত, আবার কেউ বলত—“এসব করে কী হবে?”, “গাছ লাগিয়ে কি সংসার চলবে?”, “চাষাবাদ না করে জমিতে গাছ লাগাচ্ছে!”

বিশেষ করে আমি যখন নিজের জমিতে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছ রোপণ শুরু করি, তখন অনেকেই বিষয়টাকে উপহাস করত। গ্রামের মানুষের কাছে জমি মানেই ছিল ধান, ফসল বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। সেখানে আমি ফলন বা লাভের কথা না ভেবে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগাচ্ছিলাম। অনেকে বলত, “এই গাছ দিয়ে কী লাভ হবে?”, “এত কষ্ট করে বৃক্ষ লাগিয়ে ভবিষ্যতে কী পাবে?”

তাদের কথাগুলো অনেক সময় কষ্ট দিত, কিন্তু আমি জানতাম আমি কী উদ্দেশ্যে কাজ করছি। আমার বিশ্বাস ছিল—আজ যেটা মানুষ বুঝছে না, একদিন সেটাই তারা উপলব্ধি করবে।

বন্ধুদের মধ্যেও কেউ কেউ আমাকে নিয়ে মজা করত। যখন আমি স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে গাছের চারা কিনতাম, তখন অনেকেই অবাক হতো। তারা হয়তো তখন বুঝতে পারেনি, একটা ছোট গাছও ভবিষ্যতের জন্য কত বড় আশীর্বাদ হতে পারে।

তবে এই দীর্ঘ পথে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল আমার পরিবার, বিশেষ করে আমার মা। সবাই যখন সমালোচনা করত, মা তখন আমাকে সাহস দিতেন। তিনি কখনো আমার স্বপ্নকে ছোট করে দেখেননি। বরং বলতেন, “ভালো কাজ করলে একদিন মানুষ ঠিকই বুঝবে।”

মায়ের এই বিশ্বাস আর সমর্থন আমাকে ভেতর থেকে অনেক শক্তি দিয়েছে। হয়তো সেই সমর্থন না পেলে এত বাধা-বিপত্তির মধ্যে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যেত।

uj2

বিরল ও দেশি-বিদেশি উদ্ভিদের সমারোহে সমৃদ্ধ মাহবুবুল ইসলাম পলাশের বাগানটি বর্তমানে ৩০০টিরও বেশি দুর্লভ উদ্ভিদ প্রজাতির আশ্রয়স্থল। ছবি সৌজন্যে: মাহবুবুল ইসলাম পলাশ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ধীরে ধীরে আমার কাজের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করে। যেসব গাছ একসময় ছোট চারা ছিল, সেগুলো বড় হয়ে ছায়া দিতে শুরু করে, পরিবেশ বদলাতে শুরু করে। তখন অনেকেই এসে বলেছে—“তুমি ঠিক কাজটাই করেছিলে।”

আজ যারা একসময় সমালোচনা করত, তারাই এখন উৎসাহ দেয়, গাছ নেয়, বৃক্ষরোপণে অংশ নেয়। এই পরিবর্তন আমাকে আরও বিশ্বাসী করে তুলেছে যে, ভালো কাজের ফল একদিন না একদিন অবশ্যই মানুষের সামনে আসে।

এমন কোনো কঠিন সময় কি এসেছে, যখন আপনি মনে করেছিলেন এই কাজ আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না? সেই সময়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

হ্যাঁ, অনেকবারই এমন পরিস্থিতি এসেছে। বিশেষ করে যখন নিজের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে কাজ চালাতে হয়েছে, তখন খুব অসহায় লেগেছে। অনেক সময় গাছ লাগানোর পর সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, মানুষ যত্ন নেয়নি, কিংবা প্রকৃতির বিরূপ প্রভাবেও ক্ষতি হয়েছে।

কখনো কখনো মনে হয়েছে, এত কষ্ট করে কী লাভ? কিন্তু পরে যখন কোনো ছোট শিশু এসে বলে, “ভাইয়া, আমিও একটা গাছ লাগাতে চাই”—তখন আবার নতুন করে শক্তি পাই। বুঝতে পারি, পরিবর্তন ধীরে আসে, কিন্তু আসে।

বিরল বা বিলুপ্তপ্রায় গাছ সংরক্ষণ করতে গিয়ে এমন কোনো অভিজ্ঞতা কি হয়েছে, যা আপনাকে প্রকৃতি সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে?

বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় গাছ সংরক্ষণের কাজ করতে গিয়ে জীবনের অনেক স্মরণীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই পথ শুধু গাছ লাগানোর নয়, বরং প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক অনুভব করার একটি যাত্রা।

একবার একটি বিরল প্রজাতির গান্ধী গজারি গাছ সংগ্রহ করতে অনেক দূরের এলাকায় যেতে হয়েছিল। গাছটি সংগ্রহ করার পর গভীর রাতে ফেরার পথে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। তখন রাত প্রায় তিনটা। চারপাশ অন্ধকার, রাস্তা কাদায় ভরা, কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু গাছটিকে নিরাপদে নিয়ে আসার জন্য আমি সেটি মাথায় নিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে ফিরেছিলাম।

সেদিন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমার মনে হচ্ছিল—একটি গাছকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মানুষ কতটুকু কষ্ট করতে পারে, আর প্রকৃতি আমাদের জন্য প্রতিদিন কত কিছু নিঃস্বার্থভাবে দিয়ে যাচ্ছে। সেই রাতটি আজও আমার জীবনের অন্যতম আবেগঘন স্মৃতি।

আবার একবার কুটাখালি মালুমঘাট এলাকায় বিরল গাছ সংগ্রহ করতে গিয়ে ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। পাহাড়ি ও বনাঞ্চল এলাকায় গাছের সন্ধানে ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ বন্য হাতির খুব কাছাকাছি চলে যাই। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অল্পের জন্য হাতির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাই।

সেই সময় আমি উপলব্ধি করি, প্রকৃতি যেমন সুন্দর, তেমনি শক্তিশালীও। বন, বন্যপ্রাণী ও গাছপালা—সবকিছু মিলিয়েই প্রকৃতির ভারসাম্য তৈরি হয়। আমরা যখন বন ধ্বংস করি, তখন শুধু গাছ নয়, অসংখ্য প্রাণীর বাসস্থানও ধ্বংস করি।

এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আমি বুঝেছি, পরিবেশ রক্ষা মানে শুধু গাছ লাগানো নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব।

আজ যখন কোনো বিরল গাছের চারা দেখি, তখন শুধু একটি গাছ দেখি না—আমি সেখানে একটি হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস, একটি পরিবেশব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে পাই।

আপনার এই দীর্ঘ যাত্রার পেছনে এমন কোনো মানুষ আছেন কি, যিনি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছেন?

আমার জীবনে অনেক মানুষ আছেন, যারা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে প্রকৃতি নিজেই। পাশাপাশি কিছু শিক্ষক, প্রবীণ বৃক্ষপ্রেমী এবং সমাজের নিঃস্বার্থ মানুষদের কাজ দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি।

বিশেষ করে যারা কোনো স্বার্থ ছাড়াই সমাজের জন্য কাজ করেন, তাদের দেখেই শিখেছি—মানুষের জীবনের আসল সৌন্দর্য অন্যের জন্য কিছু করার মধ্যে। বিশেষ করে আমার মা সাপোর্ট দিয়েছেন।

মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এমন কোনো ঘটনা কি ঘটেছে, যা আপনাকে সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ বা মানবিকভাবে নাড়া দিয়েছে?

একবার একটি বৃদ্ধ মানুষ আমার কাছ থেকে একটি গাছের চারা নিয়ে বলেছিলেন, “আমি হয়তো এই গাছের পুরো ফল দেখতে পারব না, কিন্তু আমার নাতিরা দেখবে।” কথাটা শুনে আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম।

তখন মনে হয়েছিল, গাছ লাগানো আসলে ভবিষ্যতের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার মতো একটি কাজ। এই অনুভূতিগুলোই আমাকে বারবার মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

আপনি যখন বিনামূল্যে গাছ বিতরণ করেন, তখন মানুষের প্রতিক্রিয়া থেকে এমন কী অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, যা আপনাকে নতুনভাবে কিছু শিখিয়েছে?

অনেক সময় দেখেছি, একজন দরিদ্র মানুষও খুব যত্ন করে একটি গাছ নিয়ে যায়, যেন সেটি তার পরিবারের সদস্য। আবার এমনও হয়েছে, কেউ শুধু শখের বশে গাছ নিয়েছে কিন্তু পরে যত্ন নেয়নি।

আরও পড়ুনঃ শহরে ইচ্ছেমতো গাছ লাগালেই তাপমাত্রা কমে না!

এসব অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি—গাছ বিতরণ করাই যথেষ্ট নয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন গাছকে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে ভাবতে শিখবে, তখনই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে। ৬৪ জেলায় বিনামূল্যে বৃক্ষ রোপণ করেছি সবাই অনেক ভালোবাসা দিয়েছে

আপনার মতে, পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা বা মিসকনসেপশন কোনটি, যা এখনো সমাজে প্রচলিত আছে?

সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, মানুষ মনে করে পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকার বা কিছু সংগঠনের দায়িত্ব। অথচ প্রকৃতি রক্ষা প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত দায়িত্ব।

আরেকটি বিষয় হলো, অনেকে মনে করে শুধু একটি দিবস পালন করলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু পরিবেশ রক্ষা কোনো একদিনের কাজ নয়; এটি প্রতিদিনের অভ্যাস ও সচেতনতার বিষয়।

এই দীর্ঘ পথচলায় একজন মানুষ হিসেবে আপনার নিজের ভেতরে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে? আগের “পলাশ” আর বর্তমান “পলাশ”-এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কী?

আগে আমি শুধু নিজের স্বপ্ন নিয়ে ভাবতাম, এখন সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথাও ভাবি। এই কাজ আমাকে অনেক বেশি ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল এবং মানবিক করেছে।

প্রকৃতির কাছ থেকে আমি সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো নিঃস্বার্থভাবে দিতে জানতে হয়। আজ আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষকে বুঝতে শিখেছি এবং ছোট ছোট কাজের মধ্যেও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখতে পাই।

আপনি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ ছড়িয়ে দেওয়ার যে স্বপ্ন দেখছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, ভয় বা ব্যক্তিগত ঝুঁকি কোথায় দেখেন?

বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করার স্বপ্নটা আমার কাছে শুধু একটি পরিকল্পনা নয়, এটি একটি দায়িত্ব ও ভালোবাসার জায়গা থেকে তৈরি হওয়া দীর্ঘ আন্দোলন। আমি বিশ্বাস করি, পরিবেশ রক্ষার কাজ কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দেশের প্রতিটি জেলা, প্রতিটি মানুষকে এই আন্দোলনের অংশ হতে হবে।

এই লক্ষ্য নিয়েই আমি দেশের ৬৪ জেলায় পরিবেশ যাত্রা করেছি। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মানুষকে পরিবেশ সচেতন করার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য পাটের ব্যাগ ব্যবহারের প্রচার করেছি। আমি মানুষের কাছে বারবার একটি কথাই তুলে ধরেছি—প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস বদলাতে হবে।

অনেক জায়গায় মানুষ আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এসেছে, আবার কোথাও উদাসীনতাও দেখেছি। তবে প্রতিটি যাত্রা আমাকে নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন শিক্ষা দিয়েছে।

এই দীর্ঘ পথচলায় আমি শুধু সাধারণ গাছ নয়, মহাবিপন্ন ও বিরল প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ ও রোপণের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। এর মধ্যে “বৈলাম” গাছ নিয়ে কাজ করা আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা।

বৈলাম গাছ এমন একটি মহাবিপন্ন বৃক্ষ, যা প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং প্রায় ৭০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে সক্ষম। এই গাছ শুধু একটি বৃক্ষ নয়, এটি প্রকৃতির দীর্ঘ ইতিহাস ও জীববৈচিত্র্যের এক অসাধারণ নিদর্শন।

আমি যখন এই গাছ রোপণ করি, তখন মনে হয় আমি শুধু একটি চারা লাগাচ্ছি না; বরং ভবিষ্যৎ কয়েকশ বছরের জন্য একটি জীবন্ত ঐতিহ্য রেখে যাচ্ছি।

তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করা। অনেক সময় মানুষ শুরুতে আগ্রহ দেখালেও পরে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে না। আবার পরিবেশের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাও বড় একটি বাধা।

ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় ভয় হলো যদি আমরা এখনই প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা না রাখি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি অসুস্থ, উষ্ণ ও বিপর্যস্ত পৃথিবী পাবে। নদী হারাবে, বন কমে যাবে, প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। তখন হয়তো মানুষ বুঝবে, কিন্তু অনেক দেরি হয়ে যাবে।

তবুও আমি আশাবাদী। কারণ আমি দেখেছি, দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। আমি বিশ্বাস করি, যদি তরুণরা এগিয়ে আসে এবং সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব নেয়, তাহলে একদিন বাংলাদেশজুড়ে একটি শক্তিশালী সবুজ আন্দোলন গড়ে উঠবে।

আমার স্বপ্ন শুধু গাছ লাগানো নয়; আমি এমন একটি সচেতন প্রজন্ম তৈরি করতে চাই, যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসবে, পরিবেশ রক্ষাকে দায়িত্ব মনে করবে এবং ভবিষ্যতের পৃথিবীকে আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করে যাবে।

লেখা ও সাক্ষাৎকার : জয়া মাহবুব

শহরে ইচ্ছেমতো গাছ লাগালেই তাপমাত্রা কমে না!

Previous article

অস্ত্রোপচার না করে শব্দ তরঙ্গেই জব্দ হবে পারকিনসন্সের মতো জটিল স্নায়ু রোগ

Next article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *