জীবনযাপন

সানস্ক্রিন না ময়েশ্চারাইজার? শুষ্ক ত্বকের জন্য গরমে কোনটি বেশি জরুরি?

1
j1

গ্রীষ্মের প্রখর তাপ আর ভ্যাপসা গরমে আমাদের জনজীবন যখন অতিষ্ঠ, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে আমাদের ত্বকের ওপর। বিশেষ করে যাদের ত্বক শুষ্ক, তাদের জন্য এই সময়টা এক দ্বিমুখী সংকট। একদিকে রোদের তীব্রতায় ত্বক পুড়ে যাওয়ার ভয়, অন্যদিকে এসির শুষ্ক বাতাস আর ঘামের কারণে আর্দ্রতা হারিয়ে ত্বক হয়ে পড়ে খসখসে ও প্রাণহীন। অনেকে মনে করেন গরম মানেই ত্বকে প্রচুর তেল জমবে, তাই ময়েশ্চারাইজার বা ভারী সানস্ক্রিন ব্যবহারের প্রয়োজন নেই এই ভুল ধারণা থেকেই ত্বকের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি শুরু হয়।

আজ আমরা আলোচনা করব কেন শুষ্ক ত্বকের জন্য গ্রীষ্মকালীন বিশেষ যত্ন প্রয়োজন এবং কীভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সঠিক পণ্য বেছে নেবেন।

শুষ্ক ত্বকে গ্রীষ্মের আঘাত

কেন গ্রীষ্মকাল শুষ্ক ত্বকের জন্য বিপজ্জনক? এর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে:

তীব্র ইউভি রশ্মি: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে ইউভি ইনডেক্স অত্যন্ত বেশি থাকে। এই রশ্মি সরাসরি ত্বকের ‘কোলাজেন’ ভেঙে ফেলে, যা শুষ্ক ত্বকে খুব দ্রুত বলিরেখা ও কালচে ছোপ তৈরি করে।

ট্রান্স-এপিডার্মাল ওয়াটার লস (TEWL): প্রচণ্ড গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে আমরা প্রচুর ঘামি। এই ঘামের সাথে ত্বকের ভেতরের জলীয় অংশ বা ময়েশ্চার বেরিয়ে যায়, ফলে ত্বক ভেতর থেকে শুকিয়ে ‘ডিহাইড্রেটেড’ হয়ে পড়ে।

এয়ার কন্ডিশনারের প্রভাব: আমরা যারা দিনের দীর্ঘ সময় এসিতে কাটাই, তাদের ত্বক আরও দ্রুত আর্দ্রতা হারায়। এসি বাতাস থেকে পানি শুষে নেয়, যা আপনার ত্বককে চুলকানিযুক্ত ও টানটান করে তোলে।

ড্রাই স্কিনে সানস্ক্রিন ও ময়েশ্চারাইজার – দুটোই কি দরকার?

শুধু সানস্ক্রিন কি ত্বককে হাইড্রেট করতে পারে? সানস্ক্রিনের মূল কাজ হলো সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করা। কিছু সানস্ক্রিনে গ্লিসারিন বা ফসফোলিপিডস থাকলে তা সামান্য হাইড্রেশনও দিতে পারে এবং ত্বকের “টানটান” ভাব কমাতে সাহায্য করে। যদি আপনার ত্বক হালকা শুষ্ক হয়, তাহলে এমন ময়েশ্চারাইজিং সানস্ক্রিন অনেক সময় যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু যদি ত্বক খুব বেশি শুষ্ক বা খসখসে হয়, তাহলে শুধু সানস্ক্রিন যথেষ্ট নয়। কারণ গরম, ঘাম, এবং এসির কারণে ত্বক থেকে দ্রুত পানি কমে যায়, ফলে ত্বক আরও শুকিয়ে যায়।

কখন ময়েশ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিন একসাথে ব্যবহার করবেন?

  • আপনার ত্বক যদি খুব শুষ্ক হয় বা
  • ত্বক খসখসে হয়ে যায়
  • দীর্ঘ সময় এসিতে থাকতে হয়

ত্বক সেনসিটিভ বা বয়সের কারণে তেল কম উৎপন্ন করে

সঠিক ধাপ: প্রথমে একটি ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। এরপর হালকা ভেজা ত্বকেই ময়েশ্চারাইজার লাগান। এটি ত্বকের ভেতরে পানি আটকে রাখবে। তার অন্তত ৫-১০ মিনিট পর সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।

পণ্য নির্বাচনে যেসব উপাদান খুঁজবেন

পণ্য নির্বাচনে সঠিক উপাদান খুঁজে নেওয়া শুষ্ক ত্বকের যত্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। কারণ আপনার ত্বক কীভাবে আর্দ্রতা ধরে রাখবে, কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবে সবকিছু অনেকটাই নির্ভর করে ব্যবহৃত পণ্যের উপাদানের ওপর। তাই শুধু ব্র্যান্ড বা দাম নয়, লেবেলের উপাদান তালিকা মনোযোগ দিয়ে পড়া জরুরি।

হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ও গ্লিসারিন: এই উপাদানগুলোকে বলা হয় “হিউমেকট্যান্ট”, অর্থাৎ এগুলো বাতাস থেকে আর্দ্রতা টেনে এনে ত্বকের ভেতরে ধরে রাখে। শুষ্ক ত্বকের ক্ষেত্রে এগুলো খুব কার্যকর, কারণ এগুলো ত্বককে তাৎক্ষণিকভাবে প্লাম্প ও হাইড্রেটেড দেখায়। বিশেষ করে ফেসওয়াশ বা সিরামের পরে এই উপাদানযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

সিরামাইড ও স্কোয়ালিন: ত্বকের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা স্তর বা “স্কিন ব্যারিয়ার” শক্ত রাখতে এই উপাদানগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শুষ্ক ত্বকে এই ব্যারিয়ার দুর্বল হয়ে যায়, ফলে সহজেই আর্দ্রতা বের হয়ে যায়। সিরামাইড ত্বকের কোষগুলোকে একসঙ্গে বেঁধে রাখে, আর স্কোয়ালিন ত্বককে নরম ও মসৃণ রাখে, পাশাপাশি আর্দ্রতা লক করে।

অ্যালানটোইন ও প্যানথেনল: এগুলো ত্বককে শান্ত করে এবং জ্বালাপোড়া কমায়। রোদে পোড়া, রুক্ষ বা সংবেদনশীল ত্বকের জন্য এই উপাদানগুলো বিশেষভাবে উপকারী। এগুলো ত্বকের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকেও সহায়তা করে, ফলে ত্বক ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে।

যেসব উপাদান এড়িয়ে চলবেন

শুষ্ক ত্বকের ক্ষেত্রে কিছু উপাদান সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন—

অতিরিক্ত অ্যালকোহল: এটি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল সরিয়ে দেয়, ফলে ত্বক আরও শুষ্ক হয়ে পড়ে।

কৃত্রিম কড়া সুগন্ধি: এগুলো সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালাপোড়া বা অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে।

‘ম্যাট ফিনিশ’ বা ক্লে সমৃদ্ধ পণ্য: এগুলো সাধারণত তেল শোষণ করার জন্য তৈরি, যা শুষ্ক ত্বকের জন্য উল্টো ক্ষতিকর যা ত্বককে আরও টানটান ও রুক্ষ করে তোলে।

এসপিএফ ও টেক্সচার নির্বাচন

আপনার লাইফস্টাইল অনুযায়ী এসপিএফ বেছে নিন:

এসপিএফ ৩০: যারা মূলত ঘরে থাকেন বা জানালার পাশে ডেস্কে কাজ করেন, তাদের জন্য এটি যথেষ্ট।

এসপিএফ ৫০ (পিএ ++++): যারা প্রতিদিন যাতায়াত করেন বা রোদে কাজ করেন, তাদের জন্য এসপিএফ ৫০ এবং পিএ রেটিং (যা ইউভি-এ রশ্মি থেকে বাঁচায়) থাকা বাধ্যতামূলক।

শুষ্ক ত্বকের জন্য ‘জেল’ ভিত্তিক সানস্ক্রিনের চেয়ে ‘লোশন’ বা ‘ক্রিম’ ভিত্তিক টেক্সচার বেশি ভালো। এটি ত্বককে একটা বাড়তি হাইড্রেটিং ফিনিশ দেয়।

ব্যবহারের কিছু গোল্ডেন রুলস

দুই আঙুলের নিয়ম: মুখ এবং গলার জন্য অন্তত দুই আঙুল পরিমাণ সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। অল্প পরিমাণে লাগালে প্যাকেটের গায়ে লেখা পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়।

পুনরায় ব্যবহার: সানস্ক্রিন একবার লাগালে তার কার্যকারিতা ২-৩ ঘণ্টার বেশি থাকে না। বিশেষ করে আপনি যদি ঘামেন বা মুখে পানি দেন, তবে অবশ্যই পুনরায় সানস্ক্রিন লাগাতে হবে।

এসি রুমে যত্ন: এসিতে থাকলে সাথে একটি হাইড্রেটিং ফেস মিস্ট রাখতে পারেন, যা ত্বকের ওপর মাঝেমধ্যে স্প্রে করলে আর্দ্রতা বজায় থাকে।

ডার্মাটোলজিস্টদের বাড়তি পরামর্শ

কেবল ওপর থেকে ক্রিম মাখলেই হবে না, ত্বকের স্বাস্থ্য ভেতর থেকেও ঠিক রাখতে হবে।

১. প্রতিদিন অন্তত ৩-৪ লিটার পানি পান করুন।

২. খাদ্যাতালিকায় তরমুজ, শসা এবং ডাবের পানির মতো হাইড্রেটিং খাবার রাখুন।

৩. রাতে শোবার আগে একটি ভালো মানের ‘নাইট ক্রিম’ বা ‘সিরামাইড’ সমৃদ্ধ লোশন ব্যবহার করুন।

ত্বকের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি সুস্থ থাকার একটি অংশ। সঠিক ময়েশ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিনের মেলবন্ধন আপনার শুষ্ক ত্বককে কেবল রোদে পোড়া থেকেই বাঁচাবে না, বরং বার্ধক্যের ছাপ কমিয়ে ত্বককে রাখবে চিরতরুণ। তাই এই গরমে রোদের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইলে সুরক্ষাই হোক আপনার প্রধান হাতিয়ার।

জয়া মাহবুব

ই-বর্জ্যের বিষে আক্রান্ত বাংলাদেশ

Previous article

উদ্ভাবনের নতুন রসায়ন : পণ্যকে অর্থবহ করতে কেন প্রয়োজন ‘কগনিটিভ ফ্রিকশন’

Next article

You may also like

1 Comment

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *