জীবনযাপন গরমে ত্বক তেলতেলে? নিয়াসিনামাইড কি হতে পারে সমাধান? By নিজস্ব প্রতিবেদক April 26, 20260 ShareTweet 0 ঢাকার আর্দ্র দুপুর। বাইরে বের হওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আপনি বেশ খুশি, ত্বক ফ্রেশ, মেকআপ ঠিকঠাক। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই ফোনের ক্যামেরা খুলে দেখলেন টি-জোনে তেল জমে গেছে, পোরস চোখে পড়ছে, আর মেকআপ যেন গলে গেছে। ঘটনাটি পরিচিত লাগছে? তৈলাক্ত ত্বক নিয়ে এই ছোট ছোট যুদ্ধগুলো অনেকের দৈনন্দিন বাস্তবতা। ব্লটিং পেপার, ম্যাটিফাইং প্রাইমার, ক্লে মাস্ক কত কিছুই তো ট্রাই করা হয়। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানে একটা জিনিস বারবার শোনা যাচ্ছে , নিয়াসিনামাইড। এটা কি সত্যিই কাজ করে, নাকি আরেকটা স্কিনকেয়ার ট্রেন্ড? চলুন একটু সহজ করে দেখি। ত্বক কেন আরও বেশি তেল তৈরি করে? প্রথমেই একটা বিষয় পরিষ্কার করা উচিৎ, ত্বকের তেল মানেই খারাপ কিছু নয়। আমাদের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই সিবাম (তেল) তৈরি করে, যা ত্বককে নরম রাখে এবং বাইরের ক্ষতিকর উপাদান থেকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই তেলের পরিমাণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে যায় আর মজার বিষয় হলো, অনেক সময় এই বাড়তি তেলের পেছনে আমাদের নিজেদেরই কিছু অভ্যাস দায়ী থাকে। অতিরিক্ত ফেসওয়াশ করা, হার্শ বা অ্যালকোহলযুক্ত টোনার ব্যবহার করা, কিংবা “ময়েশ্চারাইজার লাগালে ত্বক আরও তেলতেলে হবে” এমন ভুল ধারণা থেকে ময়েশ্চারাইজার এড়িয়ে যাওয়া এসব কারণে ত্বকের প্রাকৃতিক ব্যারিয়ার ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ত্বক ভেতর থেকে ডিহাইড্রেটেড হয়ে যায়, যদিও বাইরে থেকে তেলতেলে দেখায়। এই অবস্থায় ত্বক নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় ত্বক আরও বেশি তেল উৎপাদন শুরু করে, যাতে আর্দ্রতা ধরে রাখা যায় এবং ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। এর ফল হয় উল্টো: মুখে অতিরিক্ত শাইন বা তেলেতেলে ভাব, পোরস বেশি চোখে পড়া, আর ব্রণ হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া। সহজভাবে বললে, ত্বক যখন সঠিকভাবে হাইড্রেটেড ও প্রোটেক্টেড থাকে না, তখনই সে অতিরিক্ত তেল তৈরি করে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। তাই তৈলাক্ত ত্বক হলেও হালকা, অয়েল ফ্রি বা জেল-বেসড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা জরুরি এটাই ত্বককে শান্ত রাখে এবং অতিরিক্ত তেল তৈরির প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে। নিয়াসিনামাইড কীভাবে ত্বকের অতিরিক্ত তেলতেলে ভাব নিয়ন্ত্রণ করে? নিয়াসিনামাইড ভিটামিন বি৩-এর একটি রূপ, যা স্কিনকেয়ারে ব্যবহার করা হয় । নিয়াসিনামাইড ত্বককে “শুকিয়ে ফেলে” না। বরং এটা ধীরে ধীরে ত্বকের ভেতরের ব্যালান্স ঠিক করে, যাতে তেল উৎপাদন স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। ১) সিবাম (Sebum) নিয়ন্ত্রণ ২০০৬ সালে কসমেটিক এবং লেজার থেরাপি বিষয়ক বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত ড. জেড. ডি. ড্রেলোস এবং সহ-গবেষকদের একটি ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা যায়,, নিয়মিত ব্যবহারে নিয়াসিনামাইড সময়ের সাথে ত্বকের তেল নিঃসরণের হার কমাতে সাহায্য করে। সাধারণত ৪–৮ সপ্তাহ ব্যবহারের পর ত্বকের অতিরিক্ত তেলতেলে ভাব কমে আসতে শুরু করে। এটা ত্বকের তেল গ্রন্থিকে পুরোপুরি বন্ধ করে না বরং তাদের কাজকে স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত রাখে। ২) স্কিন ব্যারিয়ার শক্তিশালী করা নিয়াসিনামাইড ত্বকে সিরামাইড উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। সিরামাইড হলো এমন লিপিড যা স্কিন ব্যারিয়ারকে শক্ত করে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। যখন স্কিন ব্যারিয়ার শক্ত থাকে— ত্বকের ইরিটেশন কমে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন কম হয় এবং অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের প্রবণতাও হ্রাস পায় ৩) প্রদাহ কমানোর প্রভাব তৈলাক্ত ত্বক অনেক সময় ব্রণপ্রবণ হয়। নিয়াসিনামাইডের অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ ত্বকের লালচে ভাব, ফোলা এবং জ্বালা কমাতে সাহায্য করে। এর ফলে ব্রণের পুনরাবৃত্তি কমে, যা পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের চক্রও ভেঙে দেয়। ৪) পোরসের উপস্থিতি হালকা করা নিয়াসিনামাইড ব্যবহারে পোরস আসলে ছোট হয়ে যায় না, তবে যখন ত্বকে তেল ও ময়লা জমে না, তখন এগুলো অনেক কম দৃশ্যমান লাগে। অর্থাৎ, ত্বক পরিষ্কার ও ব্যালান্সড থাকলে পোরস তুলনামূলকভাবে ছোট ও মসৃণ দেখায়। “কত শতাংশ ব্যবহার করব?”-চিরচেনা প্রশ্ন নিয়াসিনামাইড বেশি ব্যবহার করা মানেই ভালো এই ধারণাটা এখানে কাজ করে না। ৪–৫% নিয়াসিনামাইডই বেশিরভাগ তৈলাক্ত ত্বকের জন্য যথেষ্ট ১০% ব্যবহার করা যায়, কিন্তু সবার জন্য না এর বেশি হলে অনেক সময় উল্টো ইরিটেশন হতে পারে কারা নিয়াসিনামাইড ব্যবহার করার আগে একটু সতর্ক থাকবেন? সাধারণভাবে নিয়াসিনামাইড প্রায় সব ধরনের ত্বকের জন্যই নিরাপদ এমনকি সেনসিটিভ বা রোজেসিয়া-প্রবণ ত্বকের ক্ষেত্রেও এটি বেশ সহনশীল হিসেবে ধরা হয়। তবে যাদের ত্বক খুবই সহজে রিঅ্যাক্ট করে বা অস্বাভাবিকভাবে সেনসিটিভ, তাদের জন্য শুরুটা কম কনসেন্ট্রেশন যেমন ২% দিয়ে করা ভালো। আরও পড়ুনঃ সানস্ক্রিন না ময়েশ্চারাইজার? শুষ্ক ত্বকের জন্য গরমে কোনটি বেশি জরুরি? এছাড়া যারা আগে থেকেই কোনো শক্তিশালী প্রেসক্রিপশন স্কিন ট্রিটমেন্ট ব্যবহার করছেন, তাদের ক্ষেত্রে নতুন কোনো শুরু করার আগে ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ। আর যেকোনো নতুন প্রোডাক্টের মতোই, পুরো মুখে ব্যবহার করার আগে ছোট একটি অংশে প্যাচ টেস্ট করে নেওয়া সবসময়ই বুদ্ধিমানের কাজ এটা ত্বকের অপ্রত্যাশিত রিঅ্যাকশন এড়াতে সাহায্য করে। এটা কি একদিনেই ম্যাজিক দেখাবে? না। নিয়াসিনামাইড ইনস্ট্যান্ট ম্যাট লুক দেয় না। কিন্তু সময়ের সাথে এমন একটা পরিবর্তন আনে, যেটা টেকসই। প্রথম ১–২ সপ্তাহে ত্বক একটু কম তেলতেলে লাগে এক মাস পর দুপুরের শাইন আগের মতো থাকে না দুই মাসে পোরস আর ব্রণে উন্নতি দেখা যায় এটা একটু স্লো, কিন্তু স্থির। অন্য প্রোডাক্টের সাথে পার্থক্যটা কোথায় ক্লে মাস্ক বা অ্যালকোহল টোনার তেল কমায় কিন্তু কয়েক ঘণ্টার জন্য। তারপর আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। নিয়াসিনামাইড একটু ভিন্ন। এটা ত্বকের “ভিতরের সমস্যা” নিয়ে কাজ করে। মানে, শুধু শাইন বা তৈলাক্ত ভাব লুকিয়ে রাখে না কারণটাই ঠিক করার চেষ্টা করে। কীভাবে রুটিনে রাখবেন? স্কিনকেয়ার মানেই যে অনেকগুলো ধাপ, দামি প্রোডাক্ট আর জটিল নিয়ম এমনটা ভাবার কারণ নেই। বরং তৈলাক্ত ত্বকের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করে একটা সহজ, নিয়মিত রুটিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে একটি হালকা ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন এতে রাতভর জমে থাকা তেল ও ময়লা সরে যাবে। এরপর লাগান নিয়াসিনামাইড, যা ত্বককে ব্যালান্স করতে সাহায্য করবে। এর পরের ধাপটা অনেকেই এড়িয়ে যান সেটা হল ময়েশ্চারাইজার। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়। হালকা, অয়েল ফ্রি বা জেল বেসড ময়েশ্চারাইজার ত্বককে ঠিক পরিমাণে হাইড্রেশন দেয়, যাতে ত্বক অতিরিক্ত তেল তৈরি করতে না চায়। সবশেষে অবশ্যই সানস্ক্রিন কারণ রোদ শুধু ট্যানই করে না, ত্বকের ব্যারিয়ারও দুর্বল করে। রাতের রুটিন আরও সহজ। সারাদিনের ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করতে ফেসওয়াশ ব্যবহার করুন, তারপর আবার নিয়াসিনামাইড, আর শেষে ময়েশ্চারাইজার দিয়ে ত্বককে শান্ত হতে দিন। শুনতে সিম্পল, কিন্তু নিয়মিত করলে এই ছোট রুটিনই বড় পরিবর্তন আনে। আর একটা কথা মনে রাখা জরুরি তৈলাক্ত ত্বক মানেই ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়া নয়। বরং এটা না ব্যবহার করলেই সব গন্ডগোল শুরু হয়। যে অভ্যাসগুলো ত্বকের বড় সমস্যার কারণ হয় ময়েশ্চারাইজার এড়িয়ে যাওয়া ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ গ্রহন না করে একসাথে অনেক শক্তিশালী স্কিন-ট্রিটিং উপাদান ব্যবহার করা, যা ত্বককে ইরিটেট করতে পারে। বেশি পারসেন্টেজ দিয়ে শুরু করা দুইদিন ব্যবহার করে ফল আশা করা সবশেষে যা জানা জরুরি নিয়াসিনামাইড কোনো “ওয়ান-নাইট মিরাকল” না এটা এমন কিছু না যা একদিন ব্যবহার করলেই ত্বক হঠাৎ বদলে যাবে। স্কিনকেয়ারে এর কাজটা অনেকটাই ধৈর্যের, ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে ফল দেওয়ার। এটা সেই বন্ধুর মতো, যে আপনার ত্বকের সাথে সময় নিয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলে। প্রথমদিকে হয়তো খুব বড় কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে না, কিন্তু নিয়মিত ব্যবহার করলে ত্বকের ভেতরের ব্যালান্সটা ধীরে ধীরে ঠিক হতে শুরু করে। ত্বক কম রিঅ্যাকটিভ হয়, অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের প্রবণতা কমে, আর ব্রণ বা ছোট ছোট ইনফ্ল্যামেশনও শান্ত হতে থাকে। নিয়াসিনামাইড মূলত ত্বকের “ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম” ঠিক করতে সাহায্য করে। একদিকে এটা সেবাম (তেল) নিয়ন্ত্রণে রাখে, অন্যদিকে স্কিন ব্যারিয়ারকে শক্তিশালী করে। ফলে ত্বক শুধু উপরে থেকে নয়, ভেতর থেকেও স্থিতিশীল হয়। অনেক সময় যারা আগে ত্বক বেশি তেলতেলে বা আনইভেন ফিল করতেন, তারা কিছু সপ্তাহ পর লক্ষ্য করেন মুখে সেই হঠাৎ শাইন কমে গেছে, আর স্কিন অনেক বেশি কম্ফোর্টেবল লাগছে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটা ত্বককে “স্ট্রিপ” করে না। বরং ত্বককে শেখায় কীভাবে নিজের ভারসাম্য নিজেই ধরে রাখতে হয়। তাই যারা বারবার হার্শ প্রোডাক্ট ব্যবহার করে ক্লান্ত, তাদের জন্য এটা একটা সেফ এবং স্মার্ট অপশন। সব মিলিয়ে, আপনি যদি এমন একটা উপাদান খুঁজে থাকেন যা— অতিরিক্ত তেল ধীরে ধীরে কমাবে ব্রণ ও লালচে ভাব শান্ত করবে আর ত্বককে দীর্ঘমেয়াদে হেলদি রাখবে তাহলে নিয়াসিনামাইড কোনো ট্রেন্ড না বরং এটা একটা লং-টার্ম স্কিন ব্যালান্সিং সাপোর্ট। ঢাকার গরমে পুরোপুরি ম্যাট থাকা হয়তো সম্ভব না, কিন্তু আয়নায় নিজের মুখ দেখে “এই তো, ম্যানেজেবল”এই ফিলটা পাওয়া? সেটা কিন্তু একদমই সম্ভব। -জয়া মাহবুব
ই-ক্যাব ইয়ুথ ফোরামের হাত ধরে শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে ই-কমার্স ক্লাবের February 8, 20232342 views