উদ্যোক্তার গল্পদেশি উদ্যোক্তা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোই উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় সুপারপাওয়ার : এলিন মাহবুব By নিজস্ব প্রতিবেদক December 15, 20250 ShareTweet 0 উদ্যোক্তা হওয়া মানে শুধু নতুন ব্যবসা শুরু করা নয়। এটা মানসিক শক্তি, দৃঢ়তা এবং সেই সঙ্গে শেখার অশেষ আগ্রহের মধ্য দিয়ে ভরা একটি যাত্রা। এই পথে আত্মবিশ্বাস অপরিহার্য। আত্মবিশ্বাস একজন মানুষকে অনিশ্চয়তার ভেতরেও সিদ্ধান্ত নিতে সাহস দেয়, ঝুঁকি নিতে উদ্বুদ্ধ করে এবং বাধার মুখে থমকে না দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি প্রদান করে। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি সূক্ষ্ম রেখা। যে রেখা পার হলে আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে রূপ নেয় অহংকারে। আর এই অহংকার একসময় উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের উদ্যোক্তা সমাজে এই দৃশ্য অচেনা নয়। অনেকেই মনে করেন পরামর্শ নেওয়া মানে নিজের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। ভুল স্বীকার করা মানে নেতৃত্ব হারানো। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় “আমি ঠিক জানি” মানসিকতা স্থান করে নেয়, আর “আমরা একসাথে শিখছি” ভাবনা পেছনে পড়ে যায়। নেতৃত্ব কখনোই সব জানার ক্ষমতা নয়। বরং নেতৃত্ব হলো নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝার সাহস। যে আত্মবিশ্বাস প্রশ্ন শুনতে পারে না, সেটি শক্ত নয়, ভঙ্গুর। এমন একজন উদ্যোক্তা যিনি শিখতে চান না, পরামর্শকে উপেক্ষা করেন, তিনি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা এবং নিজস্ব বৃদ্ধি দুটিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। একটি উদাহরণ ধরুন: একজন উদ্যোক্তা নতুন প্রযুক্তি ভিত্তিক প্রজেক্ট শুরু করেছেন। টিমের কেউ ভিন্ন মতামত দিলে তিনি সেটিকে গুরুত্ব দেন না। ফলাফল? প্রজেক্ট কিছুটা এগিয়েও যেতে পারে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ক্ষমতা কমে যায়। অন্যদিকে, যে উদ্যোক্তা নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে সহকর্মীদের মতামত শুনেন, তার সিদ্ধান্তগুলো বেশি কার্যকর হয় এবং ব্যবসাটিও টিকে যায় দীর্ঘমেয়াদে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এই শিক্ষাটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে নারীদের অনেকবার নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। তারা প্রায় মনে করেন, একবার ভুল করলে বা পরামর্শ নিলে সমাজ তাদের নেতৃত্বের মূল্য কমিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা দেখায় পরামর্শ গ্রহণ প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। সহকর্মী বা মেন্টরের মতামত শোনার মানে নিজের সক্ষমতা হারানো নয়, বরং তার বিস্তৃততা বৃদ্ধি। ব্যর্থতা স্বীকার করার মানে নিজের দক্ষতাকে প্রশ্নে ফেলা নয়, বরং শেখার সুযোগ তৈরি করা নম্রতার সঙ্গে শেখার মানসিকতা একজন উদ্যোক্তাকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে। ঢাকার এবং চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে এখন অনেক নারী উদ্যোক্তা নিজেদের উদ্যোগে সফল হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। আরও পড়ুনঃ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আশীর্বাদ, কিন্তু অনলাইন হ্যারাসমেন্ট বাঁধা কেন : এলিন মাহবুব তারা নিয়মিতভাবে উদ্যোক্তা কমিউনিটি বা ফোরামে যোগ দিচ্ছেন এবং সেখানে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ (মেন্টরশিপ) নিচ্ছেন। এই নারী উদ্যোক্তারা ভালো করে জানেন যে,অন্যের অভিজ্ঞতা শোনা এবং গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করার মাধ্যমেই নতুন সুযোগ খুঁজে বের করা যায়। অন্যের মতামত তাদের নতুন করে চিন্তা করতে এবং উদ্যোগে নতুনত্ব আনতে সাহায্য করে। সহজ কথায়, তারা একা একা চলার পরিবর্তে একে অপরের সহযোগিতা নিয়ে এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শ শুনে নিজেদের ব্যবসার দিগন্ত খুলে দিচ্ছেন। এটিই তাদের দ্রুত সফল হওয়ার মূল মন্ত্র। তরুণ উদ্যোক্তাদের বড় শক্তি তাদের গতি এবং সাহস। কিন্তু ধৈর্য না থাকলে এবং অহংকারের কারণে পরামর্শ উপেক্ষা করলে শেখার সুযোগ হারিয়ে যায়। অনেক তরুণ মনে করেন, ভুল স্বীকার করলে বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাবে। কিন্তু যারা শেখার জন্য নম্র থাকে, তারা ঝুঁকি নিয়ে নতুন প্রজেক্টে এগিয়ে যেতে পারে এবং ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সফল হয়। বাংলাদেশের অনেক নতুন ব্যবসা প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। এটি হতাশাজনক হলেও, এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা। অনেক সময় ধারণা ভালো হলেও, বাজার বোঝা বা সঠিক কৌশল নিতে না পারার কারণে এই প্রাথমিক ব্যর্থতা আসে। যারা সফল হন, তারা ব্যর্থতাকে শেষ বলে মনে করেন না, বরং এটিকে একটি শিক্ষা হিসেবে দেখেন। এই শিক্ষা তাদের দেখায় যে— কোথায় ভুল হয়েছিল এবং কীভাবে ভিন্নভাবে চেষ্টা করা যেতে পারে। ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত জীবনকে অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া ও দ্বন্দ্ব মুক্ত রাখা উদ্যোক্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরামর্শ গ্রহণ এবং নম্র মনোভাব ঝগড়া কমায়, আলোচনার সুযোগ তৈরি করে এবং টিমের মধ্যে বিশ্বাস গড়ে তোলে। যদি উদ্যোক্তা নিজের উন্নতিতে মনোযোগী হন, তাহলে ঝগড়া এবং দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়। দীর্ঘমেয়াদে এভাবেই একজন উদ্যোক্তা কেবল ব্যবসায়িক সফলতা নয়, মানসিক শক্তিও অর্জন করে। নেতৃত্ব মানে সব জানা নয়। নেতৃত্ব মানে শিখতে থাকা। যে উদ্যোক্তা পরামর্শ শুনতে জানেন, তিনি নতুন ধারণা গ্রহণ করতে সক্ষম। যে উদ্যোক্তা নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝেন, তিনি ঝুঁকি নিতে সাহস পান। যে উদ্যোক্তা অহংকারের পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসে দাঁড়ান, তিনি দলের মধ্যে বিশ্বাস এবং সমন্বয় তৈরি করেন। নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের পথ আগেই চ্যালেঞ্জে ভরা। এই পথের ওপর অহংকার যোগ করলে এগিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়। পরামর্শ গ্রহণ এবং শেখার মানসিকতা হলো সেই সেতু যা একজন উদ্যোক্তাকে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িকভাবে উন্নতি করতে সাহায্য করে। নেতৃত্ব মানে সব জানার ক্ষমতা নয়, বরং শেখার মানসিকতা বজায় রাখা। নারী ও তরুণ উদ্যোক্তারা যদি এই সত্যটি উপলব্ধি করে এগোতে পারেন, তাহলে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়—একটি সুস্থ, সহযোগিতামূলক এবং স্থায়ী উদ্যোক্তা সংস্কৃতিও গড়ে উঠবে। এলিন মাহবুব
মিল্ক ভিটা থেকে বিশ্ববাজার : এক জেলা এক পণ্য মডেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের রপ্তানি বিপ্লব April 23, 2026239 views
ই-ক্যাব ইয়ুথ ফোরামের হাত ধরে শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে ই-কমার্স ক্লাবের February 8, 20232342 views