সামাজিক সচেতনতা

সুখির স্বপ্ন!

0
uj 1

সুখি অষ্টম শ্রেণির একজন ছাত্রী। সে অসম্ভব মেধাবী। তার স্বপ্ন, বড় হয়ে একজন সফল উদ্যোক্তা হবে এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করবে। সে মোবাইলে দেখেছে, মেয়েরা কীভাবে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা করতে পারে। সেখান থেকেই তার এই আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু একদিন তার জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। স্কুল ছুটির পর বাসায় এসে সে জানতে পারে, তার পরিবার বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুখির মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি তার সব স্বপ্ন এখানেই শেষ হয়ে যাবে?

হঠাৎ তার মনে পড়ে স্কুলের প্রিয় ম্যাডাম ওয়াজমিনের কথা। সুখি আর দেরি না করে ছুটে যায় তাঁর কাছে। সুখি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে, “ম্যাডাম, আমি পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। কিন্তু আমার পরিবার আমাকে বিয়ে দিতে চায়। আমি এখন কী করব?”

ম্যাডাম ওয়াজমিন মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনেন। তিনি সুখিকে আশ্বস্ত করে বলেন, “তোমার স্বপ্নের মূল্য আছে, সুখি। ভয় পেয়ে হাল ছেড়ো না। আমরা তোমার পাশে থাকার চেষ্টা করব।”

এরপর ম্যাডাম ওয়াজমিনের মাধ্যমে সুখির পরিচয় হয় একটি এনজিওর কর্মী জোসনা আপার সঙ্গে। জোসনা আপা পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজনীয় সহায়তার পথ খুঁজতে এগিয়ে আসেন। তাঁরা সুখির পরিবারের সঙ্গে কথা বলা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে যথাযথ সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ নেন।

সুখি বুঝতে পারে, নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সাহসের পাশাপাশি সঠিক মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন। তাই জোসনা আপা ও ম্যাডাম ওয়াজমিন দুজনেই সুখিদের বাসায় যান এবং তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন।

সুখির বাবা প্রথমে রাজি না হলেও পরে রাজি হন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ান সুখির মা। তিনি কিছুতেই সুখিকে পড়াতে চান না। তাঁর দাবি, বেশি লেখাপড়া শিখে কী হবে? সুখি তো অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়েদের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেই যথেষ্ট। তিনি সুখিকে ধমকাতে থাকেন।

কিন্তু ম্যাডাম ওয়াজমিন ও জোসনা আপা দুজনেই তাকিয়ে থাকেন সুখির মায়াভরা কোমল মুখটির দিকে। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, সুখির স্বপ্ন কি শুধু তার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? অথচ সে এমন একজন উদ্যোক্তা হতে চায়, যে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরিতে কাজ করবে।

আরও পড়ুনঃ শিক্ষকসংকট ও শিক্ষার মান : দায় কার, সমাধান কোথায়?

এরপর নীরবতা ভেঙে ম্যাডাম ওয়াজমিন সুখির মাকে বলেন, “আমরা এই বাল্যবিবাহ হতে দেব না।”

সুখির মা বলেন, “আমি সুখির মা। আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেব। আপনি ঠেকানোর কে?”

ম্যাডাম ওয়াজমিন বলেন, “আমি বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক। প্রয়োজনে আমি আইনের আশ্রয় নেব।”

সঙ্গে সঙ্গে জোসনা আপা বলেন, “১৮ বছরের কম বয়সী কোনো মেয়ের বিয়ে বাল্যবিবাহ। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আপনি বিয়ের আয়োজন করুন, আর আমরা থানায় যাচ্ছি।”

সুখির বাবা সুখির মাকে বোঝাতে লাগলেন, “দেখো, সুখির মা, জেলের ভাত খাইলে তুমি খাইবা, আমি খামু না!”

সুখির মা বললেন, “এহন সব দোষ আমার না!”

অবশেষে তিনি বলেন, “ম্যাডাম, আমি সুখির বিয়ে দেব না। ও যখন পড়তে চায়, পড়বে। যা হতে চায়, হবে।”

সুখিকে জড়িয়ে ধরলেন তার মা। এভাবেই একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ হলো। আমরা চাই, হাজারো সুখির স্বপ্ন যেন ঝরে না পড়ে।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ শুধু একজনের দায়িত্ব নয়; এর জন্য প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত অংশগ্রহণ।

লেখক: হাবিবুর রহমান

শিক্ষকসংকট ও শিক্ষার মান : দায় কার, সমাধান কোথায়?

Previous article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *