উদ্যোক্তার গল্পদেশি উদ্যোক্তা

আমি স্বপ্ন দেখি একটা চেইনশপের : নাজনীন সুলতানা রিমি

1
cvr 2 3

উদ্যোক্তা জার্নালের বিশেষ আয়োজন ‌‘উদ্যোক্তা গল্প’-র আজকের পর্বে, নিজের উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেছেন নাজনীন সুলতানা রিমি। চলুন শুনি তার উদ্যোক্তা জীবনের গল্প।

লিখতে শেখার আগেই আঁকতে শিখেছিলাম। ঘরের দেয়াল, শ্লেট, বড় ভাইবোনদের খাতা এমনকি মাঝে মাঝে তাদের সহ নিজের জামাকাপড়েও এঁকে ফেলতাম এটা সেটা। সেই আঁকাআঁকি আবার সেলাইয়ের বুননে সুন্দর কারুকাজে ফুটিয়ে তুলতেন আমার মা। এভাবেই মূলত ডিজাইনের পৃথিবীতে পা রাখি আমি একেবারেই অবুঝ বয়সে।

মায়ের কাছে খুব ছোটবেলা থেকেই শেখা সূচীকর্ম। কুশি কাটার কাজ ইত্যাদির মাধ্যমে নানা রকমের ডিজাইন করতাম জামা, ওড়না, শাল, এমনকি কাঁথায়ও সেই চতুর্থ শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে। এটা ছিলো একেবারেই নেশার মতো। আস্তে আস্তে একটু বড় হই এবং ক্লাস নাইনে থাকতে, মানে ১৯৯৬ সাল থেকে নিজের জামা নিজে ডিজাইন করে বানানো শুরু করি।

কেনো জানিনা গতানুগতিক ডিজাইন একেবারেই ভালো লাগতো না। নিজে কাগজে নানারকম প্যাটার্ন, নানান বাহারী ডিজাইন এঁকে নিয়ে যেতাম টেইলারের কাছে। আমার ডিজাইনের ধারেকাছেও না গিয়ে একেবারেই মন ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো করে দেয়ার মতো অদ্ভুত টাইপের কিছু একটা বানিয়ে দিতো টেইলার। কাপড় নষ্ট হতো প্রচুর। বেঁচে যাওয়া কাপড় নিয়ে এসে সেই অদ্ভুত টাইপের কিছু একটাকে কাপড় বিভিন্ন শেইপে কেটে হাতে সেলাই করে পরার যোগ্য সুন্দর একটা জামা বানিয়ে ফেলতাম। কিন্তু এভাবে আর কতোদিন!

মনের কষ্টে একটা সময় টেইলারের উপর রাগ করেই ১৯৯৮ সালে এস.এস.সি এর পর যে সময়টা থাকে কলেজে ভর্তির আগে, সেই সময়ে সমাজকল্যানে কাটিং এন্ড টেইলারিংয়ে ভর্তি হয়ে যাই। তিন মাসের কোর্স করে পরীক্ষা দিয়ে বেশ ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হই। খুব মনে আছে ২রা আগস্ট আমাদের এস.এস.সি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়, আর সে দিনই আমার নিজের উপার্জনের টাকায় কিস্তিতে একটা সেলাইমেশিন কিনে ফেলি বাটারফ্লাই শোরুম থেকে।

এরপর নিজের সব ডিজাইন, সব শখ আর প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের জামা বানানো শুরু করি। মনে আছে ঈদের সময় এক রাতের মধ্যে ছোট বোনকে গাউন বানিয়ে দিয়েছিলাম যা দেখে সবাই তাক লেগে যায়। প্রচুর অর্ডার আসে গাউনের জন্য আত্মীয় এবং প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। কিন্তু আমি আসলে তখন সাহস করে উঠতে পারি না এতো বেশি অর্ডার নেয়ার। ইচ্ছে ছিলো মেডিকেলে পড়ার তাই লেখাপড়ার দিকেই মেইন ফোকাস থাকে।

এইচ.এস.সি’র পর সরকারি মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিলেও চান্স পাইনি। আর বেসরকারি মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছে একেবারেই ছিলো না। অনেকটা জেদের বশেই হিসাববিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়ে যাই ইডেনে ২০০১ এ। আর উদ্যোক্তা হিসেবে আমার শুরুটাও ২০০১ সালেই। দুই বান্ধবী মিলে মাত্র ৩০০ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রাইডের একটা এক কালার শাড়ি কিনে ফেলি। সাথে কিনি রঙ তুলি আর অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিস।

নিজেদের মতো করেই হ্যান্ডপেইন্টের বর্ণিল ডিজাইনে রাঙিয়ে তুলি সেই শাড়িকে। সাথে জুড়ে দেই সুতার কারুকাজ। খুব শখ আর আশা নিয়ে শুরু করি আমাদের উদ্যোগ এবং আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ পাক আমাদের নিরাশ করেন নাই। প্রথম শাড়ি সবাই খুব পছন্দ করে। আমার বান্ধবীর মামা কিনে নেন সেই শাড়িটা।

এরপর শাড়ি বিক্রির টাকা পুরোটা রি ইনভেস্ট করি এবং এভাবেই আমাদের নিজেদের ডিজাইনে একে একে যোগ হয় থ্রিপিস, ছেলে/মেয়েদের ফতুয়া, পাঞ্জাবী। কাটিং এবং সেলাই জানা থাকায় দর্জিবাড়ি যাওয়ার ঝামেলা থেকে অনেকটাই রেহাই পেয়েছিলাম, সেইসাথে কাটিং এবং প্যাটার্নে ছিলো গতানুগতিক এর চেয়ে কিছুটা ভিন্নতা, তাই সবার কাছেই মোটামুটি সমাদৃত ছিলো আমাদের কাজ।

২০০৫ এ মায়ের মৃত্যু আমার জীবন পুরোপুরি এলোমেলো করে দেয়। কাজের প্রতি আকর্ষণ একেবারেই হারিয়ে ফেলি। আমার ব্যাবসায়িক পার্টনার বান্ধবীও তার পরিবারের সাথে মিরপুর থেকে চলে যায় উত্তরায় নিজেদের বাড়িতে। সে সময়ে আসলে যোগাযোগ ব্যাবস্থা এখনকার মতো এতো উন্নত ছিলো না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একা কাজ চালিয়ে নেয়ার মতো সুযোগ আর থাকেনা। বন্ধ হয়ে যায় আমাদের যৌথ উদ্যোগ।

এরপর শুধুই পড়ালেখা। অনার্স পরীক্ষার পরই ২০০৮ এ একটা গ্রুপ অব কোম্পানিতে একাউন্টস অফিসার হিসেবে জয়েন করি, পাশাপাশি মাস্টার্স এর পড়ালেখা চলতে থাকে। কিন্তু ঐ যে, উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন, তাই চাকরিতে একের পর এক পদোন্নতির পরও কেনো যেনো ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। কাজ তো করছিলাম, পরিশ্রমও করছিলাম প্রচুর, সেই অনুযায়ী ফলাফলও পাচ্ছিলাম কিন্তু তারপরও আত্মতৃপ্তি পাচ্ছিলাম না।ftre 2 4 ২০১০ এ বিয়ের পিঁড়িতে বসি। চাকরি আর সংসার দুটোই চলতে থাকে সমান তালে। তবে কোথায় যেনো একটা অসংগতি ছিলো। কোনোভাবেই তাল লয়ে সুর বসছিলোনা যেনো। অবশেষে ২০১১ তে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আম্মুর (শ্বাশুড়ি) অনুপ্রেরণায় আবার নতুন করে শুরু করি আমার উদ্যোক্তা জীবন।

ফেসবুকে একাউন্ট খুলে একটা পেজ খুলে ফেলি, নাম দেই “নাজনীন’স ফ্যাশন হাউজ”। সেই সাথে নিজের ডিজাইন করা কিছু থ্রিপিস আর বাচ্চাদের ড্রেস বানিয়ে ননদকে পরিয়ে নিজেই ছবি তুলে পেজে আপলোড দেই। এরপর আমাকে অবাক করে দিয়ে প্রথম অর্ডার আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে, ১০ টা থ্রিপিস আর ৬টা বাচ্চাদের জামা।

ডেলিভারি দিতে হবে মোহাম্মদপুর। সেখানে ক্রেতার বাবার বাসা। উনারাই পাঠানোর ব্যাবস্থা করবেন তাদের মেয়ের কাছে। ব্যাস, সেই শুরু এবং তারপর এক বছর শুধু কাজ আর কাজ। তবে থেমে যেতে হয় আমাকে এরপর। পর পর তিনটা মেজর অপারেশন আর প্রেগন্যান্সির জটিলতার কারনে ২০১২ এবং ২০১৩, পুরো দুইটা বছর আমাকে কমপ্লিট বেড রেস্টে থাকতে হয়। দুইটা বছর, কিভাবে যে কেটেছে, কতোটা অসহায় ছিলাম তা কেবল আমি আর আমার আল্লাহ জানি।

একটু সুস্থ হয়ে আবারও কাজ শুরু করলাম ২০১৩ এর শেষের দিকে। আমার ছেলের তখন ছয় মাস বয়স। মাত্র দুই হাজার টাকা নিয়ে, আমার ডিজাইন করা দুইটা শাড়ি দিয়ে আবার শুরু করি পথচলা। শুরুতে আমার স্বামী মানা করেছিলেন কেননা সে সময়ে দেশের পরিস্থিতি খুব একটা ভাল ছিলো না। সারাদেশে আন্দোলন, পেট্রোল বোমা হামলা, সবমিলিয়ে একেবারেই প্রতিকূল পরিস্থিতি। কিন্তু আমার অদম্য ইচ্ছে আর আগ্রহের কাছে হার মেনে নেয় পরিস্থিতিও। আমার একটাই কথা, যদি কেউ না কিনে তবে আমিই পরে ফেলবো শাড়ি দুটো। কিন্তু আমি শুরু করতে চাই।

শাড়ির কাজ শেষে ছবি তুলে সে ছবি পেজে দিতেই অর্ডার চলে আসে। সেই উত্তরায় ডেলিভারি দিতে হবে। তাও ক্যাশ অন ডেলিভারি কেননা আমি নতুন। কাস্টমার ঠিক ভরসা পাচ্ছিলেন না অগ্রিম টাকা দিতে। এদিকে ক্যাশ অন ডেলিভারি দেয় এমন কোনো কুরিয়ার কোম্পানি আমি চিনতাম না। কোথাও কোনো কূলকিনারা যখন পাচ্ছিলাম না, তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন আমার স্বামীই।

সরকারের একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হয়েও হাসিমুখেই ডেলিভারি ম্যানের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তার স্ত্রীর উদ্যোগের। কাস্টমার শাড়ি পেয়ে খুবই খুশি। সুন্দরভাবে একটা রিভিউও দেন তার আইডিতে। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নাই। একের পর এক অর্ডার আসতে থাকে এবং আমি খুচরার পাশাপাশি পাইকারী ব্যাবসা শুরু করি।

অনেকেই তাদের পেজের জন্য আমার কাছে থেকে পাইকারী শাড়ি নিয়ে খুচরা বিক্রি করতেন। তেমনই একজন কাস্টমার আমাকে সন্ধান দেন তার স্বামীর কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানির যারা ক্যাশ অন ডেলিভারি দিয়ে থাকে ঢাকায় এবং তার আশেপাশে। আমার কাজ আরও সহজ হয়ে যায়।

এদিকে পেজের অগ্রগতি, নিয়মিত কাজ এবং পেজে আপলোড করা ছবি দেখে দেশের বাইরে থেকেও অনেক দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা নক দেন পাইকারিতে শাড়ি কেনার জন্য। এতো এতো শাড়ি দেশের বাইরে কিভাবে পাঠাবো খোঁজ নিতে থাকি। খোঁজ পেয়েও যাই দুই দিনেই। জিপিও এর ইএমএস সার্ভিসের মাধ্যমে আমার কাজকে পাঠাতে শুরু করি দেশের বাইরে। শুরু হয় আক্ষরিক অর্থে দেশের বাজারের পাশাপাশি আমার আন্তর্জাতিক বাজারে পথচলা।

আমি বরাবই পণ্যের গুণগত মান এবং পণ্যের স্বতন্ত্রতার ব্যাপারে সচেতন ছিলাম। আমার সবচেয়ে বড় পুঁজি আমার সততা, দৃঢ় মনোবল, সেইসাথে আমার মানসম্মত পণ্য। কমিটমেন্টের ব্যাপারে আমি বরাবরই সচেতন। আমার সততা, পণ্যের ভালো মান এবং সময় সচেতনতা ক্রেতাদের মনে আস্থার একটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। যার ফলে আমি পেয়েছি অনেক অনেক রিপিট কাস্টমার দেশে এবং বিদেশে।

ক্রেতাদের সন্তুষ্টি এবং ইতিবাচক রিভিউ আমাকে একের পর এক আরো দেশি এবং বিদেশী ক্রেতা এনে দিয়েছে, যা আমার এগিয়ে যাওয়ার পথে অনেক বড় একটা অর্জন। সততার সাথে কাজ করে গেলে, পণ্যের মান ধরে রাখলে এবং কমিটমেন্ট ঠিক থাকলে একজন উদ্যোক্তা অবশ্যই এগিয়ে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মাঝে মাঝে যে সমস্যা হয়না তা না। সেক্ষেত্রে আমি আমার ক্রেতাকে সবসময় সত্যটা জানাই। এরপর সিদ্ধান্ত তার উপর ছেড়ে দেই। আজ পর্যন্ত আমার এই সত্য জানানোর জন্য আমি নিরাশ হইনি বরং ক্রেতাদের আরো বেশি বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ।

আরও পড়ুনঃ বাচ্চাদের থেকে আগ্রহ পেয়ে উদ্যোগ শুরু করেন সিনথিয়া রূম্পা

এই দীর্ঘ সময়ের পথচলা লেখা পড়ে যতোটা সহজ মনে হচ্ছে, এতোটা সহজ ছিলোনা। আমার মাত্র ছয় মাসের ছোট বাচ্চাকে নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। রাত তিনটা চারটা পর্যন্ত কাজ করেছি কেননা আমার ক্লায়েন্ট দেশের পাশাপাশি দেশের বাইরেরও ছিলেন। টাইম জোনের ভিন্নতার কারনে তাদের সুবিধাজনক সময়ে আমাকে সময় দিতে হয়েছে।

আবার সকাল সাড়ে ছয়টায় এলার্ম দিয়ে রাখতাম, সকালের নাস্তা বানাতে হবে যে। রান্না, সন্তানকে সামলানো, সংসারের দেখাশোনা, সব সামলাতে হয়েছে একা হাতে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত জেগে পেজে সময় দিয়েছি, ব্যাবসাকে গুছিয়ে নিয়েছি। এমনো হয়েছে পা আর কোমরের তীব্র ব্যথায় ঠিকমতো হাঁটতে পারতাম না। তারপরও দমে যাইনি।

এমন নয় যে আমার আর্থিক অভাব ছিলো বা আমার স্বামী আমাদের মা ছেলের ভরনপোষণ দিতে পারছিলেন না। আমার যে অভাব ছিলো, তা হচ্ছে নিজের নাম, নিজের পরিচয়ে বাঁচার অভাব। আমি অমুকের সন্তান, অমুকের স্ত্রী, অমুকের মায়ের পরিচয়ে পরিচিত হতে চাইনি।

আমি আমার নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে চেয়েছি। নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণ করতে চেয়েছি। নিজের মতো করে চলার স্বাধীনতা চেয়েছি, স্বাবলম্বী হতে চেয়েছি কেননা আজীবন এই আমি কারো কাছে হাত পাতিনি নিজের প্রয়োজনের জন্য। ক্লাস সিক্স থেকে আমি স্বাবলম্বী। নিজের সমস্ত খরচ নিজে বহন করতাম। স্কলারশিপ আর টিউশন, পার্ট টাইম জব এবং পরবর্তীতে নিজের যোগ্যতায় ফুল টাইম জব করে নিজের লেখাপড়া সহ সকল চাহিদা পূরণ করেছি। সুতরাং সবকিছুর জন্য স্বামীর কাছে চাওয়াটা যে কতোটা কষ্টকর ছিলো আমার জন্য তা কেবল আমি জানি।

ব্যাবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এই সময়টাতে আমাকে শুনতে হয়েছে অনেক কটুবাক্য। সইতে হয়েছে তীব্র তিরষ্কার। “এতো পড়ালেখার পর এখন দর্জি হইছে”, “আরে ও তো চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন দর্জিগিড়ি করে”, “এখন শাড়ি আর জামাকাপড় পেইন্ট করে, কয়দিন পর রাস্তার সাইনবোর্ড পেইন্ট করবে”, আবার কেউ কেউ “তালুকদার বাবার দোকানদার মেয়ে” বলেও টিপ্পনী কেটেছে।

জ্বি, আমি দোকানদার। ২০১১ থেকে অনলাইন দোকানদার, এরপর ২০১৮ সাল থেকে অনলাইনের পাশাপাশি একজন অফলাইন দোকানদারও। বর্তমানে বসুন্ধরা সিটি শপিংমল এবং চট্টগ্রামে আমার দুইটা আউটলেট আছে। নিউমার্কেটে ছোট একটা কারখানা আছে।

আমি দর্জি, তাই পৃথিবীর মোট ১৭ টা দেশে নিয়মিতভাবে রপ্তানি হয় আমার ডিজাইন করা পোশাক। দেশে এবং দেশের বাইরে সব মিলিয়ে ৫৬ জন উদ্যোক্তা কাজ করে, এই দর্জির সাথে। জাতীয় টিভি চ্যানেলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং নাটকে এই দর্জির ডিজাইন করা পোশাক ব্যাবহার করা হয়। এই দর্জি আমি বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎকার দিয়েছি নিজের কাজ ও ডিজাইন নিয়ে টিভিতে এবং জাতীয় দৈনিকে।

আমি একজন স্বপ্নবাজ। এতোটাই স্বপ্নবাজ যে এই ৪১ বছর বয়সে এসেও নিজের ১০ বছরের পুরাতন প্রতিষ্ঠিত ব্র‍্যান্ড কে পাশে রেখে নিজের মায়ের নামে নতুন ব্র‍্যান্ড আম্বিয়া – Ambia কে নিজের দেশ সহ পৃথিবীর আনাচে কানাচে পরিচিত করার স্বপ্নে বিভোর। সেই স্বপ্ন পূরণের কাজও করছি এবং আল্লাহপাকের অশেষ রহমতে একটু একটু করে এগিয়েও যাচ্ছি।

মাছরাঙ্গা টিভিতে রূপকথা প্রোগ্রামে উপস্থাপিকার পোশাক যাচ্ছে আমার মায়ের নামের পোশাকের ব্র‍্যান্ড “আম্বিয়া-Ambia” থেকে যার অনেকগুলো পর্ব প্রচারিতও হয়ে গেছে। সেইসাথে ইন্ডিপেনডেন্ট টিভিতেও ওয়ালটন বাহারি ইফতার প্রোগ্রামেও উপস্থাপিকার পোশাক ছিলো আমার “আম্বিয়া-Ambia”র সৌজন্যে।

উদ্যোক্তা জীবনের এই ২৩ বছরে একবার দীর্ঘ বিরতির পাশাপাশি সাময়িকভাবেও থেমে যেতে হয়েছে বহুবার, মুখ থুবড়ে পড়েছি বহুবার, নোংরা বিজনেস এবং ক্ষমতার পলিটিক্সের শিকার হয়েছি বহুবার, তবুও থেমে যাইনি আলহামদুলিল্লাহ।

আমি স্বপ্ন দেখি একটা চেইনশপের। দেশের প্রত্যেকটা জেলা তো বটেই, দেশের বাইরেও বিস্তৃত করতে চাই আমার/আমাদের পণ্য। কর্নেল হার্লেন্ড স্যান্ডার আমার অনুপ্রেরণা তার থেমে না যাওয়া জীবনের জন্য। ৬০ বছর বয়সে যদি তিনি সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন, আমার তো আরও ১৯ বছর কঠোর পরিশ্রম করা বাকি (যদি আল্লাহ পাক চান এবং হায়াত রাখেন)। বর্তমানে আমার দুইটা ব্র‍্যান্ড নিয়েই সমানভাবে কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

আমার মতোই আরও যারা নিজের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তাদেরকে বলতে চাই, কেউ যদি আপনার কষ্টের কামাই, আপনার আত্মসম্মানবোধ এবং হালাল উপার্জনকে আপনার দুর্বলতা ভেবে আপনাকে কটাক্ষ করে নীচু দেখাতে চায়, তাহলে তাকে আপনার সবচেয়ে চমৎকার, ঝলমলে আর অমায়িক হাসিটা উপহার দিন।

আপনার কাজ দিয়ে দেখিয়ে দিন আপনার আর তার মাঝের সামাজিক মর্যাদার ব্যবধানকে। তার ছুঁড়ে দেয়া ঢিলকে আপনার চলার পথে বিছিয়ে পথটাকে আরও মজবুত করুন। দেখিয়ে দিন যে তালুকদার বাবার এই দোকানদার মেয়েরাই বরং সকলের আইডল হতে পারে। এই দর্জিরাই সকলের সম্মান পায়। এই পেইন্টাররাও একটা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। নিজের পরিবার, সমাজের পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে দেশকে। থেমে যাবেন না প্লিজ। হেরে যাবেন না।

চলার পথে আমাকেও বার বার থামতে হয়েছে, মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে, কিন্তু আমি আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। আবার মনোবল শক্ত করে এগিয়ে গিয়েছি। আমাদের চলার পথে সাময়িক ভাবে থেমে যেতে হতেই পারে, কমা (,) আসতেই পারে, কিন্তু দারি (।) যেনো না আসে। একেবারেই যেনো থেমে না যাই। ইনশাআল্লাহ এই দোকানদার মেয়েরাই একদিন পুরো পৃথিবী জয় করে নিবে।

পরিশেষে ধন্যবাদ জানাই ইডিএফ গ্রুপকে যা নারী উদ্যোক্তাদের স্বপ্নের পথে আন্তরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে চমৎকার একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে উদোক্তাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য। এভাবেই আরো প্রসারিত হোক তাদের কার্যক্রম, এগিয়ে যাক উদ্যোক্তারা।

উদ্যোক্তা জার্নাল/মাসুদুজ্জামান রাসেল

বাচ্চাদের থেকে আগ্রহ পেয়ে উদ্যোগ শুরু করেন সিনথিয়া রূম্পা

Previous article

ক্লায়েন্ট সন্তুষ্টি আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার : তাসফিয়া মান্নান

Next article

You may also like

1 Comment

  1. […] আরও পড়ুনঃ আমি স্বপ্ন দেখি একটা চেইনশপের : নাজনীন… […]

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *