মতামত

ই-বর্জ্যের বিষে আক্রান্ত বাংলাদেশ

0
e3

বর্তমানে ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে আমাদের হাতের স্মার্টফোন, টেবিলের ল্যাপটপ কিংবা ঘরের কোণে থাকা পুরোনো টেলিভিশনগুলো যখন অকেজো হয়ে পড়ে, তখন সেগুলো কেবল আবর্জনা থাকে না; বরং হয়ে ওঠে এক একটি ‘বিষাক্ত বোমা’। বাংলাদেশে আইটি খাতের অভাবনীয় প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য। কিন্তু এই অগ্রগতির সমান্তরালে যে পরিবেশগত অবিচার ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা থেকে যাচ্ছে আলোচনার আড়ালে।

আমদানিকৃত রিকন্ডিশন্ড পণ্য

বাংলাদেশের বাজারে রিকন্ডিশন্ড বা পুরোনো ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনের একটি বিশাল বাজার রয়েছে। স্বল্পমূল্যে প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা থাকলেও, এর অন্ধকার দিকটি হলো এই পণ্যগুলোর স্থায়িত্ব। উন্নত দেশ থেকে আসা এই পণ্যগুলোর একটি বড় অংশ কয়েক মাস ব্যবহারের পরই অকেজো হয়ে পড়ে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকা খুঁজে দেখা যায়, এই অকেজো ল্যাপটপের ব্যাটারি, সার্কিট বোর্ড এবং মনিটরগুলো ধ্বংস করার কোনো বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি বাংলাদেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড বা মতিঝিলের পেছনের গলিগুলোতে দেখা যায়, সাধারণ ভাঙারি শ্রমিকরা কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভাঙছে সার্কিট বোর্ড। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিগুলো অবহেলায় ফেলে রাখা হচ্ছে সাধারণ ডাস্টবিনে, যা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে মাটির গভীরে চলে যাচ্ছে।

রিসাইকেলিংয়ের নামে ‘বর্জ্য ডাম্পিং’

প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক একটি চক্র সেকেন্ড-হ্যান্ড হিসেবে উন্নত বিশ্বের ই-বর্জ্য বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। আইনি জটিলতা এড়াতে এগুলোকে অনেক সময় ব্যবহারযোগ্য পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বন্দরে আসার পর দেখা যায়, এর প্রায় ৪০ শতাংশই অকেজো। উন্নত দেশগুলো তাদের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উচ্চ খরচ এড়াতে বাংলাদেশকে একটি সস্তা ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি কেবল পরিবেশগত দূষণ নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশগত অপরাধ বা এনভায়রনমেন্টাল ইনজাস্টিস।

পারদ ও সিসার বিষ

ই-বর্জ্যের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো এতে থাকা সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম এবং ব্রোমিনেটেড ফ্লেম রিটার্ড্যান্টস। গণমাধ্যমের তথ্য থেকে জানা যায়, রাজধানীর বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের তীরের মাটি ও পানিতে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুনঃ সংকট যখন রূপান্তরের কারিগর

এর বড় একটি কারণ আশপাশের ছোট ছোট কারখানায় অপরিকল্পিতভাবে ই-বর্জ্য থেকে তামা বা মূল্যবান ধাতু নিষ্কাশন। একজন শ্রমিক যখন খালি হাতে একটি সিআরটি মনিটর ভাঙেন, তখন তাতে থাকা ফসফরাস ও বেরিলিয়াম তার ফুসফুসে প্রবেশ করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি অকেজো করা, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি এবং গর্ভবতী নারীদের বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মদানের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর বা ধোলাইখাল এলাকায় ই-বর্জ্য নিয়ে কাজ করা শ্রমিকদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের রক্তে সিসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি।

আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা চাই

আধুনিক জীবন প্রযুক্তি ছাড়া অসম্ভব, কিন্তু সেই প্রযুক্তি যেন প্রাণের বিনিময়ে না আসে। বাংলাদেশে ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১’ থাকলেও তার প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। যে কোম্পানি পণ্যটি উৎপাদন বা আমদানি করছে, সেটি নষ্ট হওয়ার পর ফিরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও তাদের নিতে হবে।

প্রযুক্তির আলো যেন কেবল শহরের ধনিক শ্রেণির ড্রয়িংরুমে সীমাবদ্ধ না থাকে, আর তার বিষ যেন প্রান্তিক মানুষের রক্তে না মেশে, তবেই নিশ্চিত হবে প্রকৃত পরিবেশগত বিচার। প্রযুক্তির এই অন্ধকার দিকটি দূর করতে হলে টেকসই উন্নয়ন ও কঠোর আইনি তদারকির কোনো বিকল্প নেই।

মাসুদুজ্জামান রাসেল

পহেলা বৈশাখে একদিনের অর্থনীতি : সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা  

Previous article

সানস্ক্রিন না ময়েশ্চারাইজার? শুষ্ক ত্বকের জন্য গরমে কোনটি বেশি জরুরি?

Next article

You may also like

Comments

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *