মতামত

কোলাহলের মাঝেও নিঃশব্দতা

1
j1

ড্রয়িং রুমজুড়ে মানুষের কলরব। কারো হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, কারো মুখে সদ্য শোনা কোনো কৌতুকের রেশ। আড্ডার মাঝপথে কাপ-পিরিচের সেই চেনা ‘টুংটাং’ শব্দে চারপাশটা বেশ জীবন্ত মনে হয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এক টুকরো প্রাণবন্ত উৎসবের ছবি। কিন্তু এই হাসিখুশি মুখগুলোর ভিড়েই কি সবাই সত্যিই উপস্থিত?

মাঝে মাঝে এই উৎসবমুখর পরিবেশেই কারোর ভেতরে হানা দেয় এক অজানা নিস্তব্ধতা। চারদিকে শব্দের মিছিল, অথচ তার মনের অন্দরে কেবলই ধূসর শূন্যতা। সেখানে আলাপ আছে কিন্তু সংযোগ নেই, শব্দ আছে কিন্তু গভীর কোনো বোঝাপড়া নেই। এই সূক্ষ্ম অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, একাকীত্ব মানেই নিভৃত কোনো ঘরে একা থাকা নয়; বরং এটি হৃদয়ের এমন এক নিভৃত হাহাকার, যা সহস্র মানুষের ভিড়েও সমানভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

একাকীত্ব আসলে ‘অনুবাদের’ ব্যর্থতা

আমরা সাধারণত একাকীত্বকে খুব সরলভাবে ব্যাখ্যা করি, মানুষ নেই, তাই একা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মানুষ পাশে থেকেও একাকীত্ব থাকতে পারে।

সুইস মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং এর দৃষ্টিতে, একাকীত্ব মূলত শারীরিক বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং এটি সেই ব্যবধান, যেখানে আমাদের ভেতরের অনুভূতিগুলো অন্যের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় না। আমরা কথা বলি, কিন্তু আমাদের অনুভূতি ঠিকভাবে “অনুবাদ” হয় না। এই অনুবাদের ব্যর্থতাই তৈরি করে কোলাহলের মাঝের নিঃশব্দতা।

নৈকট্য আর সংযোগ এক নয়

ডিজিটাল যুগে আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি “সংযুক্ত” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য বন্ধু, সারাক্ষণ মেসেজিং, নিয়মিত যোগাযোগ। তবুও একাকীত্ব কমে না; অনেক ক্ষেত্রে আরও তীব্র হয়। কারণ আমরা একটি মৌলিক পার্থক্য ভুলে যাই কাছে থাকা আর সংযোগ এক জিনিস নয়।

বিভিন্ন গবেষণাও এই বিষয়টি স্পষ্ট করে। উদাহরণ হিসেবে, সিগনা-এর জাতীয় জরিপগুলো দেখায়, তরুণ প্রজন্ম যারা সবচেয়ে বেশি অনলাইনে সংযুক্ত, তাদের মধ্যেই একাকীত্বের অনুভূতি বেশি। একইভাবে, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর এক পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় কমালে একাকীত্ব ও বিষণ্নতার লক্ষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। আর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এর দীর্ঘমেয়াদি “প্রাপ্তবয়স্ক উন্নয়ন সমীক্ষা” বলছে, মানুষের সুস্থতার সবচেয়ে বড় পূর্বাভাসক হলো গভীর, অর্থপূর্ণ সম্পর্ক। এখানে মানুষের সংখ্যা নয়, বরং সম্পর্কের গুণগত মানই আসল।

আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনও এই বিভ্রান্তিকে বাড়ায়। আমরা কাছাকাছি থাকি, কথা বলি, আড্ডা দিই কিন্তু বেশিরভাগ আলাপই থাকে সাধারণ : আবহাওয়া, চলতি বিষয় বা হালকা গল্প। এই “সামান্য আলাপ” বা স্মল টক অস্বস্তি কমায় এবং সামাজিকভাবে আমাদের খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে। কিন্তু এর একটি অদৃশ্য খরচ আছে এটি দেয়ালের মতো কাজ করে, যেখানে আমরা সংযুক্ত থাকি ঠিকই, কিন্তু একে অপরের কাছে পুরোপুরি উন্মুক্ত হই না।

ফলে সম্পর্কের সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু সংযোগের গভীরতা বাড়ে না। আর ঠিক এখানেই তৈরি হয় সেই নিঃশব্দ দূরত্ব যেখানে মানুষ পাশে থাকে ঠিকই, তবুও প্রকৃত বোঝাপড়া অনুপস্থিত থাকে।

বোঝাপড়ার বিকল্প ভাষা

আমাদের সবার জীবনেই এমন কিছু জাদুকরী মুহূর্ত আসে, যখন নিঝুম কোনো রাতে একটি বইয়ের পাতার ভাঁজে কিংবা পুরনো কোনো গানের সুরের মূর্ছনায় আমরা হঠাৎ থমকে দাঁড়াই। মনে হয় আরে! এই অবিকল কথাটাই তো আমি বলতে চেয়েছিলাম! ঠিক সেই মুহূর্তে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অব্যক্ত কোনো এক ভার যেন নিমেষেই নেমে যায়। মনে হয়, এই বিশাল পৃথিবীতে অন্তত কেউ একজন আমার মনের সেই গহিন ভাষাটি পড়তে পেরেছে।

আসলে সংযোগ বা বোঝাপড়ার ভাষা সবসময় মানুষের উপস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মাঝেমধ্যে একটি বইয়ের পাতা, একটি গানের লিরিক বা কারো লেখা একটি কলাম হঠাৎ আপনার সুপ্ত অনুভূতিগুলোকে জীবন্ত করে তোলে। সেই মুহূর্তে মনে হয়, অচেনা কোনো লেখক বা শিল্পী যেন আপনার মনের একদম গভীরে উঁকি দিয়ে আপনার গোপন কথাগুলো জেনে গেছেন।

এই মুহূর্তগুলো আমাদের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের ভেতরের জগতটা অদ্ভুত, অস্বাভাবিক বা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আমরা আসলে একা নই; আমাদের অনুভূতির সেই গভীরতাটুকু প্রকাশের জন্য কেবল সঠিক ‘ভাষা’ বা ‘মাধ্যম’-এর অভাব ছিল। যখনই আমরা সেই ভাষার দেখা পাই, তখনই আমাদের ভেতরের নিঃশব্দ দূরত্বটা ঘুচতে শুরু করে।

কেন আমরা নিজেদের ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারি না

আমাদের মনের ভেতরে যা চলে এবং আমরা মুখে যা বলি এই দুটোর মধ্যে একটা বড় ‘গ্যাপ’ বা ফাঁক থেকে যায়। ধরুন, আপনি যখন কাউকে বলেন, “আমি খুব টেনশনে আছি,” তখন সে হয়তো তার নিজের জীবনের কোনো টেনশনের কথা ভাবে। কিন্তু আপনার টেনশনটা আসলে কেমন? সেটা কি বুক ধড়ফড় করা ভয়, নাকি ভবিষ্যতে কী হবে তা নিয়ে একধরণের অস্থিরতা?

আবার হয়ত আপনি কাউকে বললেন,” আমি জীবনের একটি উদ্দেশ্য খুঁজছি”, “প্যাশন” বা “উদ্দেশ্য” শব্দগুলো অনেকটা ওপরে ওপরে কথা বলার মতো। আমরা যখন ভেতরের সুনির্দিষ্ট অনুভূতি যেমন: “ব্যর্থ হওয়ার ভয়” বা “ছোট্ট কোনো প্রাপ্তিতে অদ্ভুত আনন্দ” না বলে এই ধরণের বড় বড় শব্দ ব্যবহার করি, তখন সামনের মানুষটি আমাদের মনের আসল ছবিটা দেখতে পায় না।

তারা শুধু শব্দগুলো শোনে, আপনার ভেতরের অনুভূতিটা অনুভব করতে পারে না। আপনি যখন শুধু তথ্য দেন, তখন অপর পক্ষ আপনার মস্তিস্কের সাথে কথা বলে। আর যখন আপনি আপনার অনুভূতির গল্প বলেন, তখন সে আপনার হৃদয়ের সাথে কথা বলে। হৃদয়ের সংযোগ ছাড়া একাকীত্ব কখোনই কাটে না।

যোগাযোগ: সাহসের এক নাম

প্রকৃত যোগাযোগ মানে শুধু কথা বলা নয়, বরং নিজের মনের কথা সাহস করে অন্যকে জানানো। নিজের ভেতরের আসল সত্যটা যখন আমরা প্রকাশ করি, তখন মনের মধ্যে কিছুটা ভয় কাজ করে ,যদি সে ভুল বোঝে? যদি আমাকে গুরুত্ব না দেয়? এই ভয় বা ‘ঝুঁকি’ আছে বলেই আমরা সহজে মনের দরজা খুলতে চাই না। কিন্তু এই দেয়ালটুকু না ভাঙলে কোনো সম্পর্কের গভীরতা ছোঁয়া সম্ভব নয়।

সহজভাবে বললে, যোগাযোগ কেবল একতরফা কথা বলে যাওয়া নয়। এটি একটি দ্বিমুখী পথ। এখানে যেমন বলার সাহস দরকার, তেমনি অন্যকে শোনার এবং বোঝার ধৈর্যও দরকার। আমরা যখন নিজেদের আড়াল করার অভ্যাস ছেড়ে সত্যিটা বলতে শুরু করি, তখনই অন্য মানুষের হৃদয়ের সাথে আমাদের আসল সংযোগ তৈরি হয়। এই ছোট সাহসটুকুই একটি কৃত্রিম সম্পর্ককে সত্যিকারের অর্থপূর্ণ সম্পর্কে বদলে দেয়।

‘অনুবাদক’-এর খোঁজে

একাকীত্বের সমাধান বেশি মানুষ নয়। সমাধান হলো এমন মানুষ পাওয়া, যারা আপনার শব্দের আড়ালের অনুভূতিটাও পড়তে পারে।

যারা শুধু কথা শোনে না, অর্থ বোঝে। এক অর্থে, তারা আপনার “অনুবাদক”। এমন মানুষ খুব বেশি পাওয়া যায় না। কিন্তু একজনও যথেষ্ট। কারণ গভীর বোঝাপড়া সংখ্যার ওপর নয়, গভীরতার ওপর নির্ভর করে।

দেয়াল নয়, সেতু

এই বাস্তবতায় কিছু ছোট পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ যেমন : শোনার অভ্যাস তৈরি করা, বিশ্বস্ত মানুষের কাছে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রকাশ করা এবং সবাই আপনাকে পুরোপুরি বুঝবে এই অবাস্তব প্রত্যাশা কমিয়ে আনা। এই ছোট পরিবর্তনগুলোই সম্পর্কের ভেতরের দেয়াল ভেঙে সেতু তৈরি করে।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে বাহ্যিক উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভেতরের সত্য প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকেই লুকিয়ে ফেলতে শেখে আর সেই আড়ালই একাকীত্বকে আরও গভীর করে।

সমাধান তাই ভিড় বাড়ানো নয়। সমাধান হলো নিজেকে বুঝতে শেখা ও সেই মানুষদের খুঁজে নেওয়া, যারা সত্যিই আপনাকে শুনতে চায়।

-জয়া মাহবুব

গরমে ত্বক তেলতেলে? নিয়াসিনামাইড কি হতে পারে সমাধান?

Previous article

দরজা নেই, তবু চলছে ব্যবসা : ক্লাউড কিচেন বিপ্লব

Next article

You may also like

1 Comment

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *