উদ্যোক্তার গল্পদেশি উদ্যোক্তা

আমার প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অর্জন কাস্টমারের সন্তুষ্টি : রওনক জাহান

1
cvr 2
উদ্যোক্তা জার্নালের বিশেষ আয়োজন ‌‘উদ্যোক্তা গল্প’-র আজকের পর্বে, কথা হলো উদ্যোক্তা রওনক জাহানের সঙ্গে। আজ শুনবো তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প।

আমি রওনক জাহান। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানাতে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা।

ছোটবেলা থেকে রান্নার প্রতি আমার একটা আলাদা আকর্ষণ ছিলো। আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন আমার মা অসুস্থ হয়ে যান। সময়ের পরিক্রমায় আস্তে আস্তে রান্নাটা শিখতে হয়েছিলো আমার। এরপর বিভিন্ন সময় টিভি বা বই পড়ে বিভিন্ন রেসিপি করার চেষ্টা করতাম। ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিলো রান্না নিয়ে কিছু করার। আমি নিজে খেতে ও খাওয়াতে ভালোবাসি।

এখন আমি স্বাস্থ্যসম্মত হোমমেড খাবার নিয়ে কাজ করছি। আমার একটি অনলাইন পেজ আছে নাম শখের রান্নাঘর। ঘরে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি বিভিন্ন রকম খাবার ও পিঠা নিয়ে কাজ করছি। নারিকেল দুধে হাঁসের মাংস ও চালের রুটি। সারা বছর ধরে এই খাবারটি আমি বিক্রি করি। আর যারা যারা একবার নিয়েছে তারা এ খাবারটার ফ্যান হয়ে গেছে।

আসলে কাজের শুরুটা বলতে গেলে একটা গল্প শেয়ার করতে হবে। ২০২০ এ আমার হাজব্যান্ড সহ আমি ঢাকাতে সেটেল হই। দিনগুলো অনেক স্বপ্নের মতো কাটছিলো। এর মধ্যে শখ করে ২০২০ এর ফেব্রুয়ারিতে একটি পেজ খুলি আর এ কারণেই আমার পেজের নাম দিই শখের রান্নাঘর। তবে এগুলো নিয়ে আমি খুব একটা একটিভ ছিলাম না। ওই যে বললাম না অনেক স্বপ্নের মতো দিন কাটছিলো।

২০২০ এর মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনা শুরু হয়। দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি আস্তে আস্তে খারাপের দিকে চলে যায়। ২০২০ এর জুন মাসে আমার হাজব্যান্ডের জবটা ছাড়তে হয়। মুহূর্তেই আমার চারদিকটা অন্ধকার হয়ে আসে। এ সময় আমার হাজব্যান্ড খুবই ভেঙে পড়ে।

আমার বাসার ফ্যামিলি মেম্বার চারজন কিভাবে থাকবো, কি খাবো, কোথায় যাবো এসব চিন্তা করতে করতে সেদিন রাতেই ডিসিশন নিলাম আমার নিজের কিছু একটা করতে হবে। আমার কাছে কিছু রুটির ছবি ছিলো। আল্লাহর নাম নিয়ে সেটাই পোস্ট করে দেই বিভিন্ন গ্রুপে।ftre 2 1সেখানে গুলশানের আফিফা আপু আমার পোস্ট দেখে। সেই সর্বপ্রথম ৩০ পিছ ফ্রোজেন রুটির অর্ডার করেন। বাসায় যে আটা ছিলো সেটা দিয়েই তাকে রুটিগুলো বানিয়ে পাঠাই। আর বিল আসে ৩০০ টাকা। এই ৩০০ টাকাই আমার মূলধন। এটা দিয়ে পরবর্তী অর্ডারের জন্য জিনিসপত্র কিনে ডেলিভারি করি।

একজন উদ্যোক্তা হতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অসীম ধৈর্য, সততা এবং কথার সাথে কাজের মিল রাখা।

আমার কোনো কর্মী নাই। গত পাঁচ বছর ধরে আমি নিজে একাই বাজার থেকে শুরু করে রান্না করা ও আনুষঙ্গিক কাজগুলো করে থাকি। আমার হাজব্যান্ড কিছু কিছু কাজে আমাকে সহযোগিতা করেন। এ পর্যন্ত আমি ২ থেকে ১০০ জনের খাবারের অর্ডার নিয়েছি। কিছু কিছু কাস্টমাররা প্রি অর্ডার দেন। দুইদিন বা একদিন হাতে রেখে খাবার ডেলিভারি দিতে বলেন। আমি বাজার করে আস্তে আস্তে সব গুছিয়ে রেডি করে তারপর পাঠাই, এ কারণে তেমন অসুবিধা হয় না।

আসলে যারা চাকরি করে তারা তো একজনের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আমি চাই আমার প্রতিষ্ঠানেই এক সময় অনেক মানুষ চাকরি করবেন। আর ছোটবেলা থেকেই ব্যবসাটা আমাকে একটু টানতো।

‘শখের রান্নাঘর’ আমার সন্তানের মতো। অনেক যত্ন, চড়াই উতরাই, ভালোবাসা ও শ্রম দিয়ে করা। আর একজন সন্তানকে মা যেমন ভালোবাসে ও মায়া দিয়ে আগলে রাখেন শেষ পর্যন্ত সেভাবেই আগলে রাখবো।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নারী উদ্যোক্তারা দিন দিন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা যেমন পারিবারিক ও সামাজিক এগুলো প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

আমার বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রথমত, আশেপাশের মানুষ নানারকম কথা বলে পেছনের দিকে টানতে চেয়েছিলো, কিন্তু আমি কারো কথায় কান না দিয়ে নিজের মতো কাজ করে গেছি।

আরও পড়ুনঃ ঝুঁকি নিয়ে উদ্যোগ শুরু করা মুর্শিদা সুলতানা আজ সফল উদ্যোক্তা

দ্বিতীয়ত, ডেলিভারি নিয়ে মাঝে মাঝেই ঝামেলায় পড়তে হয় ডেলিভারি ম্যানের জন্য। তৃতীয়ত, বর্তমানে যে বাজারদর এতে ব্যবসা করাটা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।

সেল আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালোই হয়। ৩০-৬০ হাজার এর মতো থাকে আবার কোনো কোনো মাসে এর চেয়ে একটু বেশিও থাকে। আলহামদুলিল্লাহ কাস্টমার অনেক বেশি সন্তুষ্ট। আজকে পর্যন্ত খাবারের কোনো খারাপ রিভিউ আসেনি।

এখন পর্যন্ত আমি কোনো সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পাই নি। তবে বিভিন্ন গ্রুপে আমার খাবার সেল বেশি হয়েছে। এমন একটি গ্রুপ হচ্ছে EDF গ্রুপ।এখানে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে বিভিন্ন টক শো, প্রচারণা এগুলোর মাধ্যমে সবাইকে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।

আমার প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অর্জন কাস্টমারের সন্তুষ্টি। চলার পথে কেউ বোন বানিয়েছেন, কেউ মেয়ে বলে ডেকেছেন। কাস্টমারদের সাথে এতো বেশি বন্ডিং
যে, আমার খাবার ডেলিভারি করতে গেলে ডেলিভারি বয় এর হাতে আমার জন্য খাবার, গিফট, পোশাক, অর্নামেন্টস অনেক কিছু পাঠায়। শুধু একজন না এরকম অনেকজন আছে। আমি অসুস্থ হলে খোঁজ খবর নেয়, আমার বাসায় দেখতে আসে। আমার উদ্যোগ নিয়ে সময় টিভিতে একটা প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছিলো। এছাড়া এফএম রেডিওতে আমি ইন্টারভিউ দিয়েছি।

আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে খাবারের মান সবচেয়ে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির করা ও আমার এই শখের রান্নাঘরকে সারা বাংলাদেশে পরিচিত করা। এছাড়া যারা পিছিয়ে আছে সেসব নারীকে স্বাবলম্বী করা।

অনেকের হয়তো স্বামীর টাকা আছে, বাবার টাকা আছে সেগুলো নিয়ে চলেন। কিন্তু যখন তাদের কোনো সমস্যা হয় সেক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারেন না। কিন্তু আপনি নিজে যদি স্বাবলম্বী হন তখন তাদের বিপদের সময় তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে পারবেন। যেটা আমার ক্ষেত্রে হয়েছিলো।

এখন আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। অনেক মানুষ অনেক রকম কথা বলেছিলো একসময়। আমি কারো কথায় কান না দিয়ে অনেক ধৈর্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলাম। এখন আমার হাজব্যান্ড নামকরা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ভালো পোস্টে জব করছেন ও আমি এর সাথে সাথে আমার বিজনেসটা সামলাচ্ছি।

পাঁচ বছর পর নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে যেনো সবার মাঝে পরিচয় দিতে পারি সেই অবস্থানেই দেখতে চাই।

উদ্যোক্তা জার্নাল/মাসুদুজ্জামান রাসেল

ঝুঁকি নিয়ে উদ্যোগ শুরু করা মুর্শিদা সুলতানা আজ সফল উদ্যোক্তা

Previous article

দেশ বিদেশের মানুষের মাঝে দেশীয় পণ্য ছড়িয়ে দিতে চান আফরিন মমতাজ

Next article

You may also like

1 Comment

  1. […] আরও পড়ুনঃ আমার প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অর্জন কাস… […]

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *