মতামত সংকট যখন রূপান্তরের কারিগর By নিজস্ব প্রতিবেদক February 22, 20261 ShareTweet 1 একটি পুরনো ইংরেজি প্রবাদ আছে— “শান্ত সমুদ্র কখনো দক্ষ নাবিক তৈরি করতে পারে না।” কথাটি শুনতে যতটা সহজ, এর গভীরতা তার চেয়েও অনেক বেশি। আমরা আমাদের জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করি একটি “মসৃণ” এবং “ঝঞ্ঝামুক্ত” পথের সন্ধানে। আমরা চাই আমাদের ক্যারিয়ার হবে বাধাহীন, সম্পর্ক হবে নিখুঁত এবং স্বাস্থ্য হবে অটুট। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জীবনের প্রকৃত শিক্ষা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা আরামদায়ক দিনগুলোতে নয়, বরং কঠিনতম সময়ের গর্ভেই জন্ম নেয়। মনোবিজ্ঞান বলছে, যারা জীবনের বড় বড় সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তারা এমন কিছু অনন্য মানসিক শক্তি বা ‘রেজিলিয়েন্স ট্রেইট’ অর্জন করেন যা একটি নিরাপদ ও বিলাসী জীবন কখনো দিতে পারে না। এই রূপান্তর কেবল পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের জন্য নয়, বরং জীবনের যেকোনো পর্যায়ে থাকা মানুষের জন্যই এক ধ্রুব সত্য। সঠিক সময়ের বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি আমাদের সমাজের একটি বড় রোগ হলো “সঠিক সময়ের” জন্য অপেক্ষা করা। আমরা ভাবি, “আরেকটু গুছিয়ে নিই, তারপর নতুন কাজটা শুরু করব” কিংবা “অবস্থা একটু অনুকূলে আসুক তারপর আগাবো।” কিন্তু যারা প্রকৃত কঠিন সময় পার করেছেন, তারা জানেন যে জীবনের ঝড় কখনো বলে-কয়ে বা প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দিয়ে আসে না। সংকট মানুষকে শেখায় যে “পারফেক্ট টাইম” বা আদর্শ সময় বলে আসলে কিছু নেই। দুর্যোগের মধ্যেই কাজ শুরু করা এবং প্রতিকূলতার মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হলো প্রকৃত সাহসের পরিচয়। যারা এটি বোঝেন, তারা আলস্য বা দ্বিধার শিকল ছিঁড়ে জীবনের যেকোনো পর্যায়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। আবেগীয় পুঁজির সঠিক বিনিয়োগ সংকটের অগ্নিপরীক্ষা শেষে মানুষের মানসিক জগতে এক বিস্ময়কর ‘ইমোশনাল ডাউনসাইজিং’ বা আবেগীয় ছাঁটাই ঘটে, যা তাকে একজন দক্ষ ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টের মতো বিচক্ষণ করে তোলে। একজন তুখোড় বিনিয়োগকারী যেমন তার প্রতিটি পয়সা বিনিয়োগের আগে লভ্যাংশের নিখুঁত হিসাব করেন, জীবনযুদ্ধে জয়ী মানুষটিও ঠিক সেভাবে তার সীমিত ‘আবেগীয় পুঁজি’ বা ইমোশনাল ক্যাপিটাল বিনিয়োগ করতে শেখেন। তিনি তখন আর তুচ্ছ বিষয়ে—যেমন প্রতিবেশীর সাথে মনমালিন্য, সহকর্মীর বাঁকা মন্তব্য কিংবা অসহ্য যানজটের মতো ‘ডেড ইনভেস্টমেন্ট’-এ নিজের মানসিক শক্তির অপচয় দেন না; বরং এই সব থেকে নিজের ইমোশনাল ফান্ড সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেন। পরিবর্তে, তিনি তার জীবনের পোর্টফোলিও সাজান অত্যন্ত কৌশলে—যেখানে অগ্রাধিকার পায় নিজের স্বাস্থ্য, পরিবারের সাথে নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক এবং জীবনের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য বা পারপাস। এগুলোই হলো জীবনের সেই ‘ব্লু-চিপ স্টার্টআপ’, যা চরম সংকটের সময়েও উচ্চ লভ্যাংশ নিশ্চিত করে। মূলত, কঠিন সময় মানুষকে শেখায় যে আবেগ কেবল অনুভব করার বিষয় নয়, এটি একটি মূল্যবান সম্পদ, যা কেবল দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই ফলাফল দেয় এমন অর্থবহ খাতেই বিনিয়োগ করা উচিত। ইতিবাচক সতর্কতা বা প্রোডাক্টিভ পেসিমিজম সাধারণত আমাদের শেখানো হয় সবসময় ইতিবাচক থাকতে। কিন্তু অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা জানেন যে অন্ধ ইতিবাচকতা অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। এর বিপরীতে “প্রোডাক্টিভ পেসিমিজম” বা গঠনমূলক সতর্কতা অনেক বেশি কার্যকর। এর অর্থ হলো—ভালো কিছুর আশা করা, কিন্তু সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য মানসিক ও বাস্তব প্রস্তুতি রাখা। এটি নেতিবাচকতা নয়, বরং এটি হলো প্রজ্ঞা। যখন আপনি জানেন যে জীবন যেকোনো সময় মোড় নিতে পারে, তখন আপনি আকস্মিক ধাক্কায় ভেঙে পড়েন না। এই মানসিক প্রস্তুতি আপনাকে কেবল টিকে থাকতেই সাহায্য করে না, বরং যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। সাধারণ মুহূর্তের অসাধারণ মাহাত্ম্য একটি সুস্থ সকাল, এক কাপ গরম চা, কিংবা প্রিয় মানুষের সাথে এক চিলতে হাসি—এগুলো আমাদের কাছে অতি সাধারণ মনে হয়। কিন্তু যারা হাসপাতালের বিছানায় দিনের পর দিন কাটিয়েছেন কিংবা প্রিয়জনকে হারানোর শোকে কাতর হয়েছেন , তাদের কাছে এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আরও পড়ুনঃ উদ্যোক্তার ভুল: কেন লক্ষ্য নয়, সিস্টেম দরকার? সংকট আমাদের দৃষ্টি স্বচ্ছ করে দেয়। যখন আপনি বড় কোনো ঝড়ের ওপর দিয়ে যাবেন, তখন আপনি বুঝতে শিখবেন যে জীবনের প্রকৃত আনন্দ বড় বড় অর্জনে নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রাপ্তির মাঝে লুকিয়ে আছে। এই উপলব্ধিকে মনোবিজ্ঞানে ‘পোস্ট-ট্রমাটিক গ্রোথ’ বলা হয়, যা মানুষের সুখের সংজ্ঞা বদলে দেয়। পরিচয়ের নমনীয়তা: আপনি কে? আমাদের পরিচয় সাধারণত আমাদের পদবি, আমাদের ব্যাংক ব্যালেন্স বা আমাদের বাহ্যিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু যখন কোনো সংকট আমাদের এই বাহ্যিক পরিচয়গুলো কেড়ে নেয় (যেমন চাকরি হারানো বা শারীরিক অক্ষমতা), তখন আমরা পরিচয় সংকটে ভুগি। যারা প্রকৃত সহনশীল, তারা শেখেন যে মানুষের পরিচয় স্থির বা অনমনীয় নয়। আজ আপনি একজন সফল পেশাজীবী হতে পারেন, কাল আপনাকে হয়তো অন্য কোন ভূমিকা পালন করতে হতে পারে। এই যে নিজের ইগো বা অহংবোধ ত্যাগ করে যেকোনো পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা—এটিই হলো শ্রেষ্ঠ মানুষের পরিচয়। পরিচয়ের এই নমনীয়তা মানুষকে যেকোনো বয়সে নতুনভাবে শুরু করার শক্তি যোগায়। অহংকার বিসর্জন এবং আজীবন শিক্ষার্থীর মন অনেকেই মনে করেন বয়স বাড়লে বা অভিজ্ঞতা বাড়লে আর শেখার কিছু নেই। কিন্তু জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা মানুষকে বিনয়ী করে তোলে। সংকটে পড়া মানুষটি বোঝেন যে তার জানার বাইরেও অনেক কিছু আছে। তারা তখন বয়সে ছোট বা অভিজ্ঞতায় কম মানুষের কাছ থেকেও শিখতে দ্বিধা করেন না। এই “রিভার্স মেন্টরশিপ” বা উল্টো শেখার মানসিকতা মানুষকে সবসময় প্রাসঙ্গিক ও প্রাণবন্ত রাখে। একাকীত্ব নয়, সংযোগই শক্তি বিপদে পড়লে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা চারদিকে দেয়াল তুলে দেওয়া। মানুষ ভাবে, “আমি আমার সমস্যা কাউকে জানতে দেব না।” কিন্তু যারা জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, তারা জানেন যে একাকীত্ব কোনো সমাধান নয়। প্রকৃত শক্তি হলো মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করা। নিজের প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য চাওয়া লজ্জার কিছু নয়। বরং এটি মানুষের মাঝে গভীর মমতা ও সামাজিক বন্ধন তৈরি করে। যারা অন্যদের সাথে মিলেমিশে সংকট মোকাবিলা করতে শেখেন, তারা কেবল নিজেরা জয়ী হন না, বরং পুরো সমাজকে শক্তিশালী করেন। সহনশীলতা বা ‘রেজিলিয়েন্স’ কোনো জাদুকরী গুণ নয় যা নিয়ে মানুষ জন্মায়। এটি গড়ে ওঠে জীবনের কঠিনতম মুহূর্তগুলোতে আমাদের নেওয়া প্রতিটি সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। আপনি ২০ বছরের তরুণ হোন বা ৬০ বছরের প্রবীণ—আপনার জীবনের প্রতিটি ক্ষত চিহ্ন আসলে আপনার সাহসিকতার পদক। মনে রাখবেন, জীবন সবসময় শান্ত থাকবে না। সমুদ্র মাঝে মাঝেই উত্তাল হবে। কিন্তু সেই উত্তাল ঢেউগুলোকে ভয় না পেয়ে যদি আপনি সেগুলোকে মোকাবিলা করার কৌশল আয়ত্ত করতে পারেন, তবে আপনিই হবেন জীবনের শ্রেষ্ঠ নাবিক। আপনার অর্জিত এই গুণগুলো কেবল আপনাকে টিকিয়েই রাখবে না, বরং আপনাকে নিয়ে যাবে এক নতুন উচ্চতায়। কখনো সংকটকে ভয় পাবেন না। এটি আপনাকে ধ্বংস করতে নয়, বরং আপনাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে এসেছে। জানেন তো, ঝড়ের পরে যে আকাশটি দেখা যায়, সেটি সবসময়ই আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার এবং উজ্জ্বল হয়। জয়া মাহবুব
ভাইরাল কেক পট্টির আড়ালে লুকানো স্বাস্থ্যঝুঁকি, নজর দিতে হবে ক্রেতা ও উদ্যোক্তা দুই পক্ষকে : এলিন মাহবুব November 6, 2025472 views
ই-ক্যাব ইয়ুথ ফোরামের হাত ধরে শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে ই-কমার্স ক্লাবের February 8, 20232342 views